পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উদযাপনের তাৎপর্য ll হাফিজ সাব্বির আহমদ
প্রকাশিত হয়েছে : ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ৪:১৪ অপরাহ্ণ

হাফিজ সাব্বির আহমদ::
আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের প্রিয় হাবীব হযরত মোহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনি রাহমাতুল্লিল আলামীন। এ দুনিয়ায় তাঁর আগমন বিশ্বজগতের জন্য রহমত। তাঁর বরকত ও ওসীলায় বিশ্বজগত সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল কারিমে বলেছেন ‘আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য রহমত হিসেবে প্রেরণ করেছি।’
তাঁর শান-মান, মর্যাদা এতোই যে, আল্লাহ তাঁকে যা দান করেছেন তা অন্য কোনো নবী রাসুলকে দান করেন নি। তাঁকে চিরন্তন কিতাব কুরআনুল কারিম দান করেছেন। মহানুভব বানিয়েছেন ও মানবতার মুক্তির দিশারী করেছেন। সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবী ও রাসুলের মর্যাদা দিয়েছেন এবং তাঁর মাধ্যমেই দ্বীনের পূর্ণতা এনেছেন। সেই প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন চর্চা, তাঁকে জানা, তাঁর সীরাত গবেষণা করে তা থেকে উপকৃত হওয়া আমাদের জন্য অত্যন্ত উপকারি।
রবিউল আউয়াল মাস আমাদের মাঝে সমাগত। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মের মাস। ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে এ মাসের ১২ তারিখ সুবহে সাদিকের প্রাতঃমুহূর্তে এ ধরাধামে তাশরীফ এনেছিলেন মানবতার নবী মোহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
অলৌকিক নানা ঘটনা প্রকাশের মাধ্যমে তিনি মহা-সমারোহে এসেছেন মা আমেনার কোলে। সেদিন তাঁর শুভাগমনকে অভিনন্দন জানিয়েছিল আরশ-কুরসী, লওহ-কলম, চন্দ্র সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্র, আকাশ বাতাসসহ গোটা বিশ্বলোক। সেদিন খানাই-কাবা অপূর্ব আলোকে আলোকিত হয়েছিল। আকাশের তারকারাজী খুশিতে যমিনের নিকটবর্তী হয়েছিল। বর্ণিত আছে, মা আমিনা একাকিনী নিজ গৃহে শায়িত। প্রসব বেদনা শুরু হলো। আসমান থেকে অবতীর্ণ হতে থাকলেন অযুত ফেরেশতা। পরমাত্মা মহিলাগণ আর বেহেশতি হুররা ঘিরে রাখলেন আমেনাকে। পরিবেশ বলে দিচ্ছে সাধারণ কোন মানুষের আগমন নয়, মহাসমারোহে দুনিয়ায় আগমন করছেন রাহমাতুল্লিাল আলামীন মোহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

এ সময়টার বর্ণনা হযরত আমেনা দিয়েছেন এভাবে, ‘তখন আমি নিজ মঞ্জিলে একা। আব্দুল মুত্তালিব কাবা তাওয়াফে রত। আমি বিরাট এক আওয়াজ শুনতে পেলাম। এতে আমি ভীত হয়ে পড়লাম। পরক্ষণেই দেখতে পেলাম একটি ধবধবে সাদা পাখি। পাখিটি তার পলক দ্বারা আমার হৃদয় মুছে দিতে থাকলো আর আমার কাছ থেকে প্রসব বেদনা ও ভয় দূর হয়ে গেল। এরপর আমি দেখলাম এক পেয়ালা সাদা পানীয়, তা আমি পান করলাম, ফলে শান্ত হয়ে গেলাম। এরপর আমি এক অপূর্ব জ্যোতি দেখতে পেলাম। আমার কাছাকাছি আরো কয়েক মহিলাকেও দেখলাম, যারা খেজুর গাছের ন্যায় লম্বা। দেখতে আবদে মনাফের বংশের মহিলাদের মত মনে হলো। তাঁদের দেখে আমি আশ্চর্য হলাম, কোথা থেকে তাঁরা আসলেন! তাদের একজন আমাকে বললেন, আমি আদম (আ.) এর স্ত্রী বিবি হাওয়া, আরেকজন বললেন আমি আছিয়া, অপরজন বললেন আমি সারাহ, আরেকজন বললেন আমি ঈসার মাতা ইমরান তনয়া মরইয়ম, আর (সুদর্শনা, সুশ্রী মহিলাদের দেখিয়ে বললেন) এরা হলেন বেহেশতী হুর। মুহূর্তেই আমি বিরাট আওয়াজ শুনতে লাগলাম, এক আওয়াজ থেকে আরেক আওয়াজ আরো ভীতিজনক। এমন সংকটাপন্ন অবস্থায় আমি আসমান ও যমীনের মধ্যে একখানা রেশমী বস্ত্র দেখতে পেলাম। আমি আসমান ও যমীনের মধ্যখানে আরো কতেক পুরুষ দেখলাম, যাদের হাতে রুপার পাত্র। তারপর আমি দেখলাম এক ঝাঁক পাখি; তাদের চক্ষু জামরুদ পাথরের এবং পাখাগুলো ইয়াকুত পাথরের। তারা আমার সম্মুখে আসল এবং আমার গৃহকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। এসময় আল্লাহ আমার চক্ষুর পর্দা খুলে দিলেন। দুনিয়ার পূর্ব থেকে পশ্চিম দিগন্ত আমি দেখতে পেলাম। আমি দুনিয়ার তিন প্রান্তে পূর্ব, পশ্চিম ও কাবার ছাদে উড্ডীন তিনখানা পতাকা দেখলাম। আমার প্রসব বেদনা উঠল, আর আমি জন্ম দিলাম মোহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে।’
আমিনা আরো বর্ণনা করেন, ‘তিনি ভূমিষ্ট হলেন, অতঃপর আল্লাহ তাআলার সিজদায় পড়ে গেলেন। আসমানের দিকে দু’হাত উত্তোলিত করে উম্মতের জন্য দোয়া করলেন। এরপর তাঁকে আমার থেকে অদৃশ্য করে জগত ঘুরিয়ে আনা হলো। তাঁর মুখমন্ডল তখন ছিল পূর্ণিমার চাঁদের ন্যায় উজ্জল আর দেহ থেকে মৃগনাভির খুশবো নিগৃত হচ্ছিল।’
এভাবে নবীজির জন্মের প্রাক্ষালে জগৎব্যাপী এক আনন্দের হিল্লোল পড়েছিল। আর এতো এতো অলৌকিক ঘটনা প্রকাশ পেয়েছিল, যার সবটুকু বর্ণনা করা এ কলেবরে অসম্ভব। তখন আরবের সমাজটা ছিল চরম অধঃপতনে নিমজ্জিত। দ্বন্দ্ব-কলহ মানুষের মাঝে লেগেই থাকত। মানবতার ছোঁয়া সমাজে ছিলোনা, মূর্তিপূজা, চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি, ব্যভিচার, মদ্যপান, সুদ-জুয়া ও নানারূপ অন্যায়-অনৈতিক কাজ ছিল মানুষের নিত্যনৈমিত্তিক কর্ম। এ অন্ধকার যুগে জন্মগ্রহণ করেও নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সব পাপকাজ থেকে মুক্ত ছিলেন। তাকে কোন পাপ স্পর্শ করেনি। তিনি ছিলেন চরিত্রবান। ছোটকাল থেকেই তাঁর চারিত্রিক মাধুর্য্যতা ফুটে উঠেছিল। সকলেই তাঁর আচার-আচরণ, কথাবার্তায় মুগ্ধ ছিল। ধীরে ধীরে তিনি অধঃপতনে নিমজ্জিত আরব সমাজকে আলোর পথ দেখালেন, সমাজে ন্যায়-ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করে আদর্শ সমাজ বিনির্মাণ করলেন। মানুষ পেলো সঠিক দিশা। হিংসা-বিদ্বেষ, পাপাচার, অনৈতিকতা, ব্যবিচারসহ সব অসঙ্গতি ছেড়ে দিয়ে মানুষ এক আল্লাহর দিকে ধাবিত হলো।
আজ আমাদের সমাজ নবীজির দেখানো সমাজ ব্যবস্থা থেকে অনেক দূরে। আইয়্যামে জাহেলিয়াত যেন আমাদের সমাজকে ছেয়ে গেছে। প্রতিদিন খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, রাহাজানি, প্রকাশ্যে হত্যা এসব যেন আমাদের সমাজে একেবারে সাধারণ বিষয়। এ থেকে উত্তরণে আমাদেরকে প্রিয়নবীর জীবন দর্শন আনুসরণ করতে হবে। বাস্তব জীবনে গ্রহণ করতে হবে নবীজির জীবনাদর্শ।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারি। তাঁর চেয়ে সুন্দর চরিত্রের অধিকারি দুনিয়ায় আর কেউ ছিলো না। হযরত আয়িশা (রা.) বলেন, তাঁর সাহাবা ও পরিবারবর্গের কেউ যখন তাঁকে ডাকতেন, তখন তিনি জবাবে বলতেন, ‘লাব্বায়িক’ আমি হাজির। এভাবেই তিনি বিনয়ী ছিলেন। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি নয় বছর রাসূল (সা.) এর খেদমতে ছিলাম, কিন্তু আমার জানা নেই, তিনি কখনো আমাকে বলেছেন, তুমি এরূপ কেন করছো? এবং তিনি কখনো আমার কাজে সামান্যতম দোষও ধরেন নি। হযরত আয়িশা (রা.) এর কাছে নবীজির চরিত্র সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, তাঁর চরিত্র ছিল ‘আল কুরআন’। অর্থাৎ নবী কারীম (সা.) এর চরিত্র ছিল সম্পূর্ণরূপে পবিত্র কুরআনের ব্যাখ্যা। তাইতো আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন, ‘নিঃসন্দেহে আপনি মহান চরিত্রের উপর অধিষ্ঠিত’।
উদারতা, বদান্যতা, দানশীলতা ছিল তাঁর আল্লাহ প্রদত্ত স্বভাবজাত গুণ। তিনি কখনো কোনো আবেদনকারীকে শুন্য হাতে ফিরিয়ে দেননি। নিজের কাছে না থাকলে কখনো কখনো ঋণ করেও তিনি অভাবী দরিদ্রদের দান করতেন। দানশীলতায় ছিলেন উদারহস্থ। হযরত ইবন উমর (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অপেক্ষা অধিক দানশীল, সাহসী, বড় বীর, অধিক ধৈর্যশীল ও পরিতুষ্ট কোন ব্যক্তিকে দেখিনি। হযরত ইবন আব্বাস (রা.) থেকেও এ মর্মে হাদিস আছে যে, তিনি বলেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবচেয়ে বেশি দানশীল ছিলেন।
সামাজিকতা ও ভ্রাতৃত্ব বন্ধনের ক্ষেত্রে তাঁর পবিত্র জীবন ছিল সমুন্নত। সবার সাথে হাসিমুখে কথা বলতেন, শিষ্টাচার রক্ষা করতেন। বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব বন্ধনের তাগিদ দিয়ে তিনি বলেছেন, ‘সম্প্রতি, সৌহার্দ্য ও সহানুভূতির ক্ষেত্রে মুমিনদের দৃষ্টান্ত এক দেহের ন্যায়, যার একটি অঙ্গ অসুস্থ হলে গোটা দেহ অসুস্থ ও অনিদ্রায় আক্রান্ত হয়। -সহীহ বুখারি।
মহানবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন মানবতার নবি। তাঁর মানবিকতা ছিল সহমর্মিতা, সহানুভূতি, সমবেদনা, শান্তি ও নিরাপত্তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, যা আজও সমাজে প্রাসঙ্গিক। আজকের সমাজ ব্যবস্থায় যেখানে অশান্তি, অন্যায়, হিংসা-বিদ্বেষ ও বৈষম্য বিদ্যমান, সেখানে তাঁর সুমহান জীবনাদর্শ একটি উন্নত ও মানবিক সমাজ গঠনের পথ সুগম করতে পারে।
তিনি সমাজে এতিম-অনাথের যেভাবে অধিকার রক্ষা করেছেন তেমনি নারী সমাজের ন্যায্য অধিকারও প্রতিষ্ঠা করেছেন। নিপীড়িত মজলুম মানুষের সাহায্যে তিনি রেখে গেছেন এক অনুপম আদর্শ। ‘হযরত আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মুসলিম মুসলিমের ভাই। সে তার উপর জুলুম করবে না এবং তাকে জালিমের হাতে সোপর্দ করবে না। যে কেউ তার ভাইয়ের অভাব পূরণ করবে আল্লাহ তার অভাব পূরণ করবেন। যে ব্যক্তি (পৃথিবীতে) কোন মুসলিমের বিপদ দূর করবে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তার বিপদসমূহ দূর করবেন। যে ব্যাক্তি কোন মুসলিমের দোষ গোপন করবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দোষ গোপন করবেন। -সহীহ বুখারী।
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরো বলেছেন, তোমার ভাইকে সাহায্য কর, সে জালিম হোক অথবা মাজলুম (অর্থাৎ জালিম ভাইকে জুলুম থেকে বিরত রাখবে এবং মাজলুম ভাইকে জালিমের হাত থেকে রক্ষা করবে)।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, মোহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি আদর্শ সমাজ বিনির্মাণে যা কিছু প্রয়োজন তার সবকিছুই আমাদের শিখিয়ে গেছেন। তাই তাঁর সাহাবাগণ সে পথ ধরেই সোনালী সমাজ বিনির্মাণ করে অর্ধ পৃথিবী শাসন করেছিলেন।
লেখক: হাফিজ সাব্বির আহমদ, পরিচালক, সিরাজাম মুনিরা জামে মসজিদ অ্যান্ড অ্যাডুকেশস সেন্টার, বার্মিংহাম, ইউকে।





