বাধার মুখে গাইবান্ধায় ‘এশিয়ার সর্ববৃহৎ’ রামমূর্তি নির্মাণ, কাজ স্থগিত
প্রকাশিত হয়েছে : ১২ জুন ২০২৬, ২:৫৫ অপরাহ্ণ

ছবি: সংগৃহীত
পূর্বদিক ডেস্ক: গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে আলোচিত ‘এশিয়ার সর্ববৃহৎ রামমূর্তি’ নির্মাণকাজ আপাতত স্থগিত ঘোষণা করেছে শ্রীশ্রী রাধা গোবিন্দ ও কালী মন্দির কর্তৃপক্ষ। প্রকল্পের অর্থায়ন ও অর্থের উৎস নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ওঠা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখার স্বার্থে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে মন্দির কমিটি।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্মাণকাজ স্থগিতের ঘোষণা দেওয়া হয়।
সংবাদ সম্মেলনে মন্দির কর্তৃপক্ষ জানায়, রামমূর্তি নির্মাণকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মহল থেকে নানা মতামত, প্রশ্ন ও প্রতিবাদ উঠে এসেছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অটুট রাখা এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান জানিয়ে নির্মাণকাজ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে প্রশাসন, রাজনৈতিক দল কিংবা অন্য কোনো পক্ষের চাপের মুখে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি বলে তারা দাবি করেন।
মন্দির কমিটির নেতারা বলেন, “আমরা বাঙালি। সকল ধর্মের মানুষের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে বিশ্বাস করি। ভবিষ্যতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।” তবে মন্দিরের নিয়মিত ধর্মীয় ও সামাজিক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলেও জানানো হয়।
এদিকে, নির্মাণাধীন রামমূর্তি অপসারণের দাবিতে পৃথক সংবাদ সম্মেলন করেছে ইমাম-উলামা পরিষদ। বিকেলে উপজেলা মডেল মসজিদের হলরুমে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির নেতারা মূর্তি নির্মাণ কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ এবং সংশ্লিষ্ট সব উদ্যোগ বাতিলের দাবি জানান।
এর আগে বুধবার (১০ জুন) উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার লক্ষ্যে একটি সম্প্রীতি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। উপজেলা পরিষদ হলরুমে আয়োজিত ওই সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ জাবের আহমেদ। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গাইবান্ধা-৩ (পলাশবাড়ী-সাদুল্লাপুর) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ আবুল কাওছার মো. নজরুল ইসলাম (লেবু)।
সমাবেশে বক্তারা গুজব, উসকানি ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণা থেকে বিরত থেকে শান্তি, সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের পরিবেশ বজায় রাখার আহ্বান জানান।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার হোসেনপুর ইউনিয়নে রামমূর্তি নির্মাণ বন্ধের দাবিতে বুধবার বিকেলে স্থানীয় পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ইমাম-উলামা পরিষদ গাইবান্ধা জেলা শাখা ও জেলার সচেতন নাগরিক সমাজ যৌথভাবে এ কর্মসূচির আয়োজন করে। এর আগে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর বরাবর আট দফা দাবি-সংবলিত একটি স্মারকলিপিও প্রদান করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে ইমাম-উলামা পরিষদের জেলা সেক্রেটারি মুফতি মানছুর রহমান খান লিখিত বক্তব্যে বলেন, “পলাশবাড়ীর হোসেনপুর ইউনিয়নে একটি বৃহৎ রামমূর্তি নির্মাণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। জনশ্রুতি অনুযায়ী এটিকে বিশ্বের সর্ববৃহৎ রামমূর্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”
তিনি দাবি করেন, বিষয়টি স্থানীয় জনগণের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা, উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি সৃষ্টি করেছে। রংপুর বিভাগের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে মন্দিরের বাইরে পর্যটনকেন্দ্র ও রিসোর্ট ঘিরে বৃহৎ পরিসরে মূর্তি নির্মাণ ভবিষ্যতে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, সামাজিক অস্থিরতা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণ হতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে প্রকল্পের উদ্যোক্তা হরিদাস চন্দ্রের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করা হয়। বক্তারা বলেন, তার বিরুদ্ধে উগ্রবাদী আচরণ, অনিয়ম ও বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
স্মারকলিপিতে উত্থাপিত আট দফা দাবির মধ্যে রয়েছে প্রকল্পটির অর্থায়নের উৎস, ব্যয়ের পরিমাণ, দেশি-বিদেশি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা এবং আর্থিক লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত; সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব ও সম্পদের উৎস যাচাই; বিদেশি অর্থায়ন বা প্রভাবের অভিযোগ গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে অনুসন্ধান; জাতীয় নিরাপত্তা, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়ন; সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ; বিদেশি কূটনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ যাচাই; কোনো অনভিপ্রেত বিদেশি হস্তক্ষেপের প্রমাণ মিললে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ; এবং গাইবান্ধা জেলা ও রংপুর বিভাগের শান্তি-শৃঙ্খলা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া।
উল্লেখ্য, রামমূর্তি নির্মাণ প্রকল্পটি নিয়ে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। এরই মধ্যে মন্দির কর্তৃপক্ষের নির্মাণকাজ স্থগিতের ঘোষণাকে পরিস্থিতি শান্ত রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পূর্বদিক/এসএ





