মুফতি মাওলানা বদরুজ্জামান রিয়াদ
ঈদে মীলাদুন্নবী ﷺ নিয়ে আজকাল কওমী অঙ্গনের একটি অংশে যে ধরনের কটূক্তি, সমালোচনা, অশ্লীল-অশ্রাব্য ভাষা প্রয়োগ, অপতৎপরতা ও ফতোয়াবাজি দেখা যায়, তা দেখে একজন সচেতন মানুষ স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন করতে পারেন— এটি কি সত্যিই উলামায়ে দেওবন্দের ঐতিহ্যগত অবস্থান, নাকি পরবর্তী সময়ে অন্য একটি মতাদর্শের প্রভাবে গড়ে ওঠা নতুন প্রবণতা? বিশেষত যখন কোনো কোনো বক্তার মুখে মীলাদ মাহফিলকে কেন্দ্র করে শিরক, কুফর, বিদআত, জাহান্নাম ইত্যাদি কঠোর শব্দ ব্যবহৃত হয়, তখন বিষয়টি আবেগ দিয়ে নয়, বরং ইতিহাস ও আকাবিরের বক্তব্য দিয়ে যাচাই করা জরুরি। কারণ মীলাদ-কিয়াম পছন্দ না করা এক বিষয়, আর মীলাদ-কিয়ামের প্রতিটি রূপকে শিরক-বিদআত বলে আখ্যায়িত করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো—এই দ্বিতীয় অবস্থানটি যদি উলামায়ে দেওবন্দের আকাবিরের বক্তব্যের ওপর আরোপ করা হয়, তাহলে সেটি ইতিহাসের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ? এখানেই মূল প্রশ্ন।
১. “শেষ যুগে পরবর্তীরা পূর্ববর্তীদের নিন্দা করবে”—এ সতর্কবার্তার আলোকে: রাসূলুল্লাহ ﷺ কিয়ামতের নিদর্শনসমূহের আলোচনায় বলেছেন—
ولَعَنَ آخرُ هذه الأمةِ أولَها
অর্থাৎ, “এই উম্মতের পরবর্তীরা তার পূর্ববর্তীদের নিন্দা করবে।” এ হাদীসকে কোনো নির্দিষ্ট সমসাময়িক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সরাসরি প্রয়োগ করা উদ্দেশ্য নয়। তবে এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা অবশ্যই রয়েছে—পরবর্তী প্রজন্ম যেন পূর্ববর্তী নেককার আলিমদের অবমাননা, হেয়প্রতিপন্ন বা অজ্ঞতার সঙ্গে বিচার না করে। আজ যখন এমন কিছু লোককে দেখা যায়, যারা নিজেদেরকে দেওবন্দের উত্তরসূরি দাবি করেন, অথচ দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাতা-পরম্পরার বহু আলিমের আমল ও বক্তব্যকে এমন ভাষায় আক্রমণ করেন যেন তাঁরা আকীদা-শরীয়ত সম্পর্কে অজ্ঞ ছিলেন, তখন বিষয়টি গভীরভাবে চিন্তার দাবি রাখে।
২. হযরত হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী রহ. : যাঁর অবস্থান অস্বীকারের উপায় নেই: উলামায়ে দেওবন্দের আধ্যাত্মিক মুরব্বি, হযরত হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী রহ. মীলাদ মাহফিলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন— এটি ইতিহাসের একটি সুপরিচিত বিষয়। তিনি ফয়সালায়ে হাফত মাসআলাতে লিখেছেন—
فقير کا مشرب يہ ہے کہ محفل مولود ميں شريک ہوتا ہوں- بلکہ برکات کا ذريعۃ سمجھ کر ہر سال منعقد کرتا ہوں اور قيام ميں لطف ولذت پاتا ہوں
অর্থাৎ, তাঁর বক্তব্যের সারকথা: “আমার মাশরাব হলো, আমি মীলাদ মাহফিলে শরিক হই; বরকতের মাধ্যম মনে করে প্রতি বছর এর আয়োজন করি এবং কিয়ামে আনন্দ ও তৃপ্তি অনুভব করি।”
এখানে বিষয়টি অত্যন্ত পরিষ্কার। এটি কোনো “মীলাদপ্রেমী” সাধারণ আলিমের বক্তব্য নয়। এটি সেই ব্যক্তির বক্তব্য, যাঁকে উলামায়ে দেওবন্দের পরবর্তী প্রজন্মের অন্যতম আধ্যাত্মিক মুরব্বি হিসেবে গ্রহণ করেছে।
অতএব আজ যদি কেউ বলেন—
“মীলাদ মাহফিল করা বা কিয়াম করা নিজেই শিরক-বিদআত; এর সঙ্গে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই” তাহলে তাঁকে প্রথমেই প্রশ্ন করতে হবে: হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী রহ.-এর এই আমল ও বক্তব্যকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? তিনি কি শিরক করছিলেন? তিনি কি বিদআতের প্রচার করছিলেন? তিনি কি শরীয়তের মৌলিক বিধান বুঝতেন না? যদি উত্তর “না” হয়, তাহলে আজকের ঢালাও ফতোয়ার ভাষা অন্তত আকাবিরের ভাষা নয়।
৩. হযরত আশরাফ আলী থানভী রহ. : পরবর্তী সময়ে অবস্থানের সূক্ষ্ম পরিবর্তন, কিন্তু আকাবিরের আমলকে অস্বীকার নয়:
হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ. উলামায়ে দেওবন্দের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব। তাঁর ফয়সালায়ে হাফত মাসআলা-র আলোচনাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে তিনি এমন মীলাদ-কিয়ামকে বিদআত বলেননি, যেখানে এগুলোকে শরীয়তের আবশ্যিক অংশ বা স্বতন্ত্র ইবাদত মনে করা হয় না। তিনি লিখেছেন—
اگر کوئی شخص ميلاد ميں اس قسم کی مخصوص کی ہوئی باتيں (تاريخ قيام وغيرہ) اختياری سمجھتا ہے اور بذات خود عبادت نھيں سمجھتا بلکہ صرف مصلحت سے ان پر عمل کرتا ہے… تو يہ بدعت نہيں ہے
অর্থাৎ, মীলাদের নির্দিষ্ট তারিখ, কিয়াম ইত্যাদিকে যদি কেউ ঐচ্ছিক মনে করে এবং এগুলোকে স্বতন্ত্র ইবাদত মনে না করে, বরং কোনো বৈধ উদ্দেশ্যে করে, তাহলে সেটিকে বিদআত বলা হবে না।
এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য বুঝতে হবে। থানভী রহ. পরবর্তী সময়ে কিছু সামাজিক বাস্তবতা, প্রচলিত ভুল আকীদা, মীলাদকে আবশ্যিক মনে করা, বিভিন্ন অনৈসলামিক কর্মকাণ্ড ইত্যাদি বিবেচনায় সতর্কতামূলক ও শর্তযুক্ত অবস্থান গ্রহণ করেছেন। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে তিনি তাঁর পীর ও মুরশিদ হাজী ইমদাদুল্লাহ রহ.-এর আমলকে শিরক বা কুফর বলে বাতিল করে দিয়েছেন। বরং তাঁর নিজের বক্তব্যেই পাওয়া যায়—
اگر تم اس کو ضروري نہيں سمجھتے ہو تو ايک دفعۃ تم قيام مت کرو- ہمارے ساتھ بيٹے رہو تو ہم ايک دفعۃ تمہارے ساتھ قيام کرنے کو تيار ہيں- يہ اس امر کا ثبوت ہو گا کہ قيام کو ناجائز يا حرام ہم بھی نہيں
সারকথা: “তোমরা যদি কিয়ামকে জরুরি মনে না কর, একবার কিয়াম না করে আমাদের সঙ্গে বসে থাকো; আমরাও একবার তোমাদের সঙ্গে কিয়াম করতে প্রস্তুত। এর দ্বারা বোঝা যাবে যে আমরাও কিয়ামকে নাজায়িয বা হারাম মনে করি না।” এই বক্তব্যের পরে কোনো ব্যক্তি যদি দাবি করেন “থানভী রহ.-এর মতে কিয়াম নিজেই হারাম/শিরক/কুফর” তাহলে তিনি থানভী রহ.-এর বক্তব্যের সঙ্গে সুবিচার করছেন না।
৪. রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী রহ. : মৌলিক হুকুম ‘মুবাহ’ হযরত রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী রহ.-এর বক্তব্য আরও স্পষ্ট। ফাতওয়ায়ে রশীদিয়া-তে তিনি হাজী ইমদাদুল্লাহ রহ.-এর বক্তব্য উল্লেখ করে বলেন—
در اصل یہ مباح ہيں
অর্থাৎ, “মূলত এগুলো মুবাহ।” এরপর তিনি বলেন, কেউ যদি এগুলোকে সুন্নত বা জরুরি মনে করে, তাহলে সমস্যা হবে। এখানে গাঙ্গুহী রহ.-এর বক্তব্যের মূল কাঠামো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:
মীলাদ-কিয়ামের মূল কাজকে তিনি একেবারে হারাম বলেননি; বরং মানুষ যখন সেটিকে শরীয়তের আবশ্যিক বিধান বানিয়ে ফেলে, তখন তিনি বিদআতের আপত্তি করেছেন। তিনি নিজেই ব্যাখ্যা করেছেন—
پس فی الحقيقت مخالفت اصل مسائل میں نہيں ہوئی
অর্থাৎ, “বাস্তবে মূল মাসআলায় কোনো মতবিরোধ হয়নি।” এই একটি বাক্যই অনেক কিছু পরিষ্কার করে দেয়। আজ যারা গাঙ্গুহী রহ.-এর নাম ব্যবহার করে বলেন “মীলাদ-কিয়াম মূলগতভাবেই বিদআত এবং নাজায়িয” তাঁদের উচিত আগে গাঙ্গুহী রহ.-এর “اصل مباح” এবং “مخالفت اصل مسائل میں نہیں ہوئی”—এই বক্তব্য দুটির ব্যাখ্যা দেওয়া।
৫. তাহলে মতভেদের প্রকৃত জায়গা কোথায়? গাঙ্গুহী রহ.-এর বক্তব্য থেকেই উত্তরটি পাওয়া যায়। “তিনি বলেন, মানুষ এগুলোকে “ضروری” বা আবশ্যিক মনে করে—এ কারণেই তিনি নিষেধ করেন। অর্থাৎ বিতর্কের কেন্দ্র ছিল: মীলাদ কি ফরজ? কিয়াম কি ওয়াজিব? এটি কি নির্দিষ্ট সময়ে করতেই হবে? এটি না করলে কি গুনাহ হবে? যদি কেউ এসব বিশ্বাস করে, তাহলে অবশ্যই তা শরীয়তের নামে এমন কিছু আবশ্যক করে দেওয়া হবে যা শরীয়ত আবশ্যক করেনি। কিন্তু এখান থেকে আরেকটি চরম সিদ্ধান্ত বের করা যায় না— “মীলাদের মাহফিল করাই শিরক।”
এ দুই বক্তব্যের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য।
৬. আল-মুহান্নাদ: দেওবন্দী আকীদার গুরুত্বপূর্ণ দলিল: দেওবন্দী আকাবিরের অবস্থান বুঝতে আল-মুহান্নাদ আলাল মুফান্নাদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি গ্রন্থ।শমাওলানা খলীল আহমদ সাহারানপুরী রহ. সেখানে মীলাদ মাহফিল সম্পর্কে হযরত আহমদ আলী সাহারানপুরী রহ.-এর বক্তব্য উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, যদি সহীহ বর্ণনার মাধ্যমে রাসূল ﷺ-এর জন্ম ও জীবনী আলোচনা করা হয়; ফরজ ইবাদতের সময়ের সঙ্গে সংঘর্ষ না হয়; সাহাবায়ে কিরাম ও খাইরুল কুরূনের নীতির বিরোধিতা না থাকে; শিরকী ও বিদআতী আকীদা না থাকে; শরীয়তবিরোধী কার্যকলাপ না থাকে; নিয়ত বিশুদ্ধ থাকে এবং এটিকে উত্তম যিকরের অন্তর্ভুক্ত মনে করা হয়, কিন্তু নির্দিষ্ট সময়কে শরীয়ত কর্তৃক আবশ্যক মনে না করা হয়— তাহলে তিনি বলেন:
لا نعلم أحدا من المسلمين أن يحكم عليه بكونه غير مشروع
অর্থাৎ, “এমন আমলকে অশরীয়তসম্মত বলবেন—এমন কোনো মুসলমানের কথা আমার জানা নেই।” এ বক্তব্যকে উপেক্ষা করে যদি কেউ বলেন— “মীলাদ মাহফিল মানেই বিদআত, মীলাদ মানেই শিরক” তাহলে প্রশ্ন হবে—আপনি কি নিজের মত বলছেন, নাকি সাহারানপুরী রহ.-এর নামে বলছেন?
৭. “মীলাদ” ও “শিরক”—দুটি শব্দ পাশাপাশি বসালেই শরঈ হুকুম প্রমাণ হয় না: এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি নীতিগত কথা বলা দরকার।শকোনো মাহফিলে ভুল আকীদা থাকলে সেই ভুল আকীদা অবশ্যই প্রত্যাখ্যানযোগ্য। কেউ যদি বিশ্বাস করে— * নবী ﷺ সর্বত্র স্বশরীরে উপস্থিত; নবী ﷺ স্বতন্ত্রভাবে গায়েব জানেন; * কোনো কাজকে শরীয়তের আবশ্যিক বিধান বানিয়ে দেয়; * অথবা শরীয়তবিরোধী অন্য কোনো বিশ্বাস রাখে— তাহলে সেই নির্দিষ্ট বিশ্বাসের প্রতিবাদ করতে হবে। কিন্তু ভুল বিশ্বাসের উপস্থিতির কারণে সমস্ত মীলাদ মাহফিলকে শিরক বলা যুক্তিগতভাবেও সঠিক নয়। যেমন নামাজের মধ্যে কোনো ব্যক্তি ভুল আকীদা পোষণ করলে “নামাজই শিরক” বলা যায় না। একইভাবে কোনো মীলাদ মাহফিলে হারাম কাজ থাকলে বলতে হবে— “এই মাহফিলের এই কাজটি হারাম।” সরাসরি বলতে হবে না— “মীলাদই হারাম।”
৮- আকাবিরকে অনুসরণ করার দাবি করলে আকাবিরের বক্তব্যও মানতে হবে : এখানেই বর্তমানের কিছু কট্টর বক্তার সবচেয়ে বড় আত্মবিরোধিতা। তাঁরা বলেন: “আমরা দেওবন্দী। আমরা আকাবিরকে মানি।” কিন্তু যখন আকাবিরের কোনো বক্তব্য তাঁদের বর্তমান পছন্দের মতের সঙ্গে মেলে না, তখন তারা তিনটি কাজের কোনো একটি করেন: ক- বক্তব্যকে আংশিক উদ্ধৃত করেন; খ- প্রসঙ্গ বাদ দেন; গ- অথবা আকাবিরের বক্তব্যকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করেন, যা মূল বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এটি আকাবিরের অনুসরণ নয়; এটি আকাবিরকে নিজের মতের সাক্ষী বানানো। আকাবিরের অনুসরণ মানে হলো— যেখানে তাঁদের বক্তব্য কঠোর, সেখানে কঠোরতা গ্রহণ করা; যেখানে তাঁরা শর্ত দিয়েছেন, সেখানে শর্ত গ্রহণ করা; যেখানে তাঁরা কোনো বিষয়কে মুবাহ বলেছেন, সেখানে সেটিকে নিজের পছন্দের কারণে হারাম বানিয়ে না দেওয়া।
৯. নতুন লা-মাযহাবি প্রভাবের প্রশ্ন : এখানে আরও একটি সংবেদনশীল বিষয় রয়েছে। বর্তমানে কওমী সমাজের কিছু তরুণ আলিম ও বক্তার বক্তব্যে এমন একটি প্রবণতা দেখা যায়, যেখানে ঐতিহ্যগত দেওবন্দী ফিকহ-তাসাওউফের বদলে আধুনিক লা-মাযহাবি/সালাফি বিতর্কের ভাষা ও মাপকাঠি প্রবল হয়ে উঠেছে। এটি কারও ব্যক্তিগত মাজহাব বা আকীদা নিয়ে আক্রমণ নয়। প্রশ্নটি হলো: যদি কোনো ব্যক্তি দেওবন্দের আকাবিরের বক্তব্যের চেয়ে অন্য একটি সমকালীন মতাদর্শের ভাষা ও সিদ্ধান্তকে বেশি প্রাধান্য দেন, তাহলে তাঁকে দেওবন্দের ঐতিহ্যের প্রকৃত উত্তরাধিকারী বলা কতটা যুক্তিসঙ্গত? দেওবন্দের ঐতিহ্য কেবল কিছু নির্দিষ্ট ফতোয়ার নাম নয়। এর মধ্যে রয়েছে— হানাফী ফিকহ; * তাসাওউফ ও ইহসান; আকাবিরের প্রতি আদব; মতভেদে ভারসাম্য; তাকফির ও তাফসিক থেকে সতর্কতা এবং বিভিন্ন আমলের হুকুম নির্ধারণে সূক্ষ্ম ফিকহী বিশ্লেষণ। অতএব কোনো বিষয়ে “বিদআত”, “শিরক”, “কুফর”—এই শব্দগুলো উচ্চারণ করলেই কেউ আকাবিরের প্রতিনিধি হয়ে যান না।শবরং দেখতে হবে: আকাবির কি সত্যিই একই ভাষায়, একই হুকুমে, একই পরিধিতে বিষয়টি বলেছেন?
১০. সবচেয়ে বড় সমস্যা : আকাবিরের আমলকে আজকের মাপকাঠিতে বিচার করা: হাজী ইমদাদুল্লাহ রহ. মীলাদ করতেন। তিনি কিয়ামে আনন্দ পেতেন। থানভী রহ. তাঁর পীরের সঙ্গে মীলাদ-কিয়ামের আলোচনা করেছেন। গাঙ্গুহী রহ. মূলত মীলাদ-কিয়ামকে মুবাহ বলেছেন। আহমদ আলী সাহারানপুরী রহ. শর্তযুক্ত মীলাদ মাহফিলকে এমন পর্যায়ে বৈধ বলেছেন যে তিনি বলেছেন—এটিকে অশরীয়তসম্মত বলার মতো কোনো মুসলমানের কথা তাঁর জানা নেই। এখন প্রশ্ন: এই আকাবিরদের সবাই কি শিরকের ব্যাপারে অজ্ঞ ছিলেন?শঅবশ্যই এমন কথা কোনো দেওবন্দী ব্যক্তি বলতে চাইবেন না। তাহলে তাঁদের বক্তব্যকে এমনভাবে উপস্থাপন করা কেন হবে, যেন তাঁরা মীলাদ-কিয়ামের মূল ধারণাটিকেই শিরক বা কুফর মনে করতেন? এখানেই ইতিহাস বিকৃতির আশঙ্কা তৈরি হয়।
১১. তবে কি মীলাদের নামে সবকিছু বৈধ? :
না। এখানেও পরিষ্কার থাকা জরুরি। মীলাদ মাহফিলের নামে যদি থাকে— অশ্লীলতা; * নারী-পুরুষের অবৈধ মিশ্রণ; জাল হাদীসকে সহীহ হিসেবে প্রচার; নবী ﷺ সম্পর্কে শরীয়তবিরোধী আকীদা; ফরজ নামাজ নষ্ট করা; অপচয় ও অহংকার; অথবা অন্য কোনো হারাম কর্মকাণ্ড— তাহলে এসবের প্রত্যেকটির বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে। কিন্তু সেই কারণে মীলাদুন্নবী ﷺ-এর সীরাত, শামায়েল, জন্ম, নবুওয়ত, মুজিযা, চরিত্র ও দরূদ-সালামের মাহফিলকে এক কথায় শিরক বলা যাবে না। এটি ফিকহী বিচক্ষণতার পরিপন্থী।
১২. মীলাদ নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে : কিন্তু আকাবিরের ওপর ফতোয়া দেওয়া যায় না। কেউ যদি ব্যক্তিগতভাবে বলেন— “আমি মীলাদুন্নবী উদযাপন করি না।” তাঁর সে অধিকার আছে। কেউ যদি বলেন— “আমি কিয়ামকে সুন্নত মনে করি না।” এটিও তাঁর ফিকহী অবস্থান হতে পারে। কেউ যদি বলেন— “বর্তমান সমাজের প্রচলিত মীলাদে অনেক অনিয়ম থাকায় আমি তা বন্ধ করতে চাই।”
এটিও আলোচনাযোগ্য।
কিন্তু যখন বলা হয়— “যারা মীলাদ করে তারা মুশরিক।” “যারা কিয়াম করে তারা বিদআতী।” “মীলাদ মাহফিলই শিরক।” তখন প্রশ্ন উঠবেই: হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী রহ.-এর ক্ষেত্রে আপনার এই ফতোয়া কোথায় দাঁড়াবে? গাঙ্গুহী রহ.-এর “اصل مباح” কোথায় যাবে? থানভী রহ.-এর “قيام کو ناجائز يا حرام ہم بھی نہيں” বক্তব্যের ব্যাখ্যা কী? আহমদ আলী সাহারানপুরী রহ.-এর “لا نعلم أحدا من المسلمين…” বক্তব্যের অবস্থান কী?
এগুলো পাশ কাটিয়ে শুধু “মীলাদ বিদআত”—এই স্লোগান আওড়ানো গবেষণা নয়।
১৩. আকাবিরের নামে আকাবির-বিরোধী অবস্থান গ্রহণ করবেন না: দেওবন্দের আকাবিরদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা ছিল— ইলমের সঙ্গে আদব, ফিকহের সঙ্গে তাকওয়া এবং মতভেদের সঙ্গে ইনসাফ। আজ যদি কেউ আকাবিরের নামে এমন একটি কঠোর মত প্রচার করেন, যার ভাষা ও ব্যাপ্তি আকাবিরের বক্তব্যের সঙ্গে মেলে না, তাহলে তাঁকে থামিয়ে প্রশ্ন করা প্রয়োজন: “আপনি কি আকাবিরের অনুসরণ করছেন, নাকি আকাবিরকে নিজের মতের অনুসারী বানাচ্ছেন?” মীলাদ-কিয়াম নিয়ে কারও মত আলাদা হতে পারে। কিন্তু মতভেদকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া উচিত নয় যেখানে— হাজী ইমদাদুল্লাহ রহ. হয়ে যান বিদআতী, গাঙ্গুহী রহ. হয়ে যান আপসকারী, থানভী রহ. হয়ে যান অস্পষ্ট, আহমদ আলী সাহারানপুরী রহ. হয়ে যান ভুলকারী— আর আধুনিক বক্তাই হয়ে যান একমাত্র সত্যের মাপকাঠি। এটি আকাবিরের অনুসরণ নয়; বরং আকাবিরের ওপর নিজের মতের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা।
প্রধান মুহাদ্দিস : দারুল হাদিস লতিফিয়া নর্থওয়েস্ট, ইউকে।