ঘোড়ার গাড়িতে প্রিয় শিক্ষকের বিদায়, ভালোবাসায় ভাসালেন প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা
প্রকাশিত হয়েছে : ১৮ আগস্ট ২০২৬, ১০:৩৭ অপরাহ্ণ

ছবি: পূর্বদিক
নিজস্ব প্রতিবেদক: বিদ্যালয়ের ফটক পেরিয়ে বের হচ্ছেন একজন শিক্ষক। পাশে নেই অবসরের চেনা নীরব বিদায়। সামনে সুসজ্জিত ঘোড়ার গাড়ি, চারপাশে বাদ্যযন্ত্রের সুর আর পেছনে শতাধিক শিক্ষার্থীর শোভাযাত্রা। ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায় প্রিয় শিক্ষককে বাড়ি পৌঁছে দিতে এমন ব্যতিক্রমী আয়োজন করেছেন তাঁরই প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা।
দীর্ঘ ৩৯ বছর যে বিদ্যালয়ে দাঁড়িয়ে অসংখ্য শিশুকে জীবনের প্রথম পাঠ দিয়েছেন, সেই বিদ্যালয় থেকেই এভাবেই বিদায় নিলেন মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার বালিগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বেলা রানী দেব।
সোমবার (১৭ আগস্ট) দুপুরে উপজেলার মুন্সীবাজার ইউনিয়নের বালিগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয় তাঁর বিদায় সংবর্ধনা। তবে এটি ছিল না নিছক অবসর উপলক্ষে আনুষ্ঠানিক বিদায়। কয়েক প্রজন্মের শিক্ষার্থীর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা প্রিয় ‘দিদি মনি’কে ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা জানানোর এক আবেগঘন আয়োজন হয়ে ওঠে অনুষ্ঠানটি।
স্থানীয়রা জানান, ১৯৮৭ সালে সহকারী শিক্ষক হিসেবে বালিগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগ দেন বেলা রানী দেব। এরপর কেটে গেছে ৩৯ বছর। দীর্ঘ এই সময়ে একই বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে তিনি পড়িয়েছেন কয়েক প্রজন্মের শিক্ষার্থীকে। যাদের হাতেখড়ি হয়েছিল তাঁর কাছে, সময়ের পরিক্রমায় তাঁদের সন্তানরাও এসেছে তাঁর কাছেই পড়তে। প্রজন্মের সঙ্গে বদলেছে তাঁর পরিচয়, তবে শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি বরাবরই ছিলেন প্রিয় ‘দিদি মনি’।
বিদায় সংবর্ধনায় তাই বর্তমান শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি ছুটে আসেন সাবেক শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সহকর্মীরাও। স্মৃতিচারণ, ভালোবাসা ও আবেগে ভারী হয়ে ওঠে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ। সংবর্ধনা শেষে শুরু হয় আরও ব্যতিক্রমী আয়োজন। বেলা রানী দেবকে একটি রকিং চেয়ারে বসিয়ে প্রতীকীভাবে শূন্যে ভাসিয়ে নেওয়া হয়। এরপর তাঁকে তোলা হয় সুসজ্জিত ঘোড়ার গাড়িতে। সামনে মোটরসাইকেল আর পেছনে শতাধিক শিক্ষার্থীর শোভাযাত্রা। বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে প্রায় চার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা তাঁকে পৌঁছে দেন বাড়িতে।
প্রাক্তন শিক্ষার্থী তুহিন জুবায়ের বলেন, “দিদি মনির বিদায়টা একটু স্মরণীয় করে রাখতে চেয়েছি। বিদ্যালয়ের প্রবাসী প্রাক্তন শিক্ষার্থীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় থাকা সবাই এতে যুক্ত ছিলেন। একজন শিক্ষাগুরু হিসেবে দিদি মনির ঋণ কখনো শোধ করা সম্ভব নয়। শুধু চেষ্টা করেছি তাঁকে একটু সম্মান ও ভালোবাসা দিতে।”
কবি ও গবেষক মহিদুর রহমান বলেন, “বেলা রানী দেবের বিদায় শুধু একজন শিক্ষকের কর্মজীবনের সমাপ্তি নয়। এটি যেন একটি দীর্ঘ সময়ের বিদায়। যে সময়ে একটি বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে প্রজন্মের পর প্রজন্ম শিশুর হাতে বই তুলে দিয়েছেন একজন শিক্ষক। সেই শিশুরাই বড় হয়ে ফিরে এসে তাঁর বিদায়ের পথ সাজিয়েছে ভালোবাসায়।”
বিদায়ের মুহূর্তে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বেলা রানী দেব। তিনি বলেন, “এই বিদ্যালয়ের সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। আজ বিদ্যালয় ছেড়ে চলে যাচ্ছি, এটা ভাবলেই আমার মনে হাহাকার করছে।”
রাজনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিপুল সিকদার বলেন, “একজন শিক্ষকের বিদায়বেলায় প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা মিলে যে আয়োজন করেছে, তা আমাকে মুগ্ধ করেছে। শিক্ষকদের মর্যাদা সব সময়ই সবার ওপরে। শিক্ষার্থীরা তাঁকে যে সম্মান দিয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।”
পূর্বদিক/এসএ





