জৌলুস হারাচ্ছে ধুলিজোড়ার শীতলপাটি
প্রকাশিত হয়েছে : ২১ নভেম্বর ২০২৫, ৯:২২ পূর্বাহ্ণ

নূরুল ইসলাম, মৌলভীবাজার
দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশীদের কাছেও ব্যাপক কদর ছিল রাজনগর উপজেলার ধুলিজোড়া কারুশিল্পীদের বানানো শীতলপাটির। গরমের আরাম খ্যাত শীতলপাটির স্থান দখল করেছে স্বল্পমূল্যের চায়নার প্রযুক্তিতে তৈরী প্ল্যাস্টিকের মাদুর। নানা প্রতিকুলতায় জৌলুস হারিয়েছে শীতলপাটি। ফলে শীতলপাটির গ্রামখ্যাত ধুলিজোড়া গ্রামের শতশত কারুশিল্পীর আয়-উপার্জন কমে যাওয়ায় দুইশতাধিক বছরের পেশা বদলে জীবিকা নির্বাহে বাধ্য হয়েছেন। তবে ১০-১২ জন হস্তশিল্পী আদিপুরুষের পেশা ধরে রেখে বিভিন্ন প্রদর্শনীতে প্রদর্শন করে অতীত ইতিহাসকে সমুজ্জ্বল রাখছেন।
কাউয়া দীঘিহাওর ছোঁয়ে বয়ে যাওয়া রাজনগর-বালাগঞ্জ খেয়াঘাট সড়কের পাশের একটি নিভৃত পল্লীর নামধুলিজোড়া। যে গ্রামের মানুষ আরামপ্রিয় বাঙালীর ব্যবহারের জন্য সুখ বিলাসপণ্য শীতল পাটি বানিয়ে দেশ-বিদেশে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেন। স্থানীয়রা জানান, প্রায় দু’শবছরের অধিক আগের শিল্পটি পৃষ্ঠপোষকতা ও আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির সুবিধা বঞ্চিত হয়ে সুনাম হারাতে বসেছে। স্থানীয় প্রবীণদের অনেকে জানান, এলাকায় শ্রুতি রয়েছে ধুলিজোড়া গ্রামে দুইশতাধিক বছর আগে গোপালের আখড়ায় হবিগঞ্জের জনৈক বৈষ্ণব থাকতেন। তিনি মূর্তার বেত দিয়ে দেবতার আসনের জন্য কারুকাজ খচিত ছোট আকৃতির মাদুর বানাতেন। বৈষ্ণবের বানানো শৈল্পিককাজ অনেকে রপ্ত করে স্থানীয় হাট-বাজারে বিক্রি করতে থাকেন। অন্যদিকে জনশ্রুতি রয়েছে কাউয়া দীঘি হাওরপাড়ের ধুলিজোড়া গ্রামের মানুষের শীতের মৌসুমে বোরোধান ফলানো ছাড়া তেমন আয়-উপার্জনের আর তেমন কোন ব্যবস্থা ছিলনা। তবে ওই গ্রামে বাড়ির পাশের খাল কিংবা নিচু জায়গায় প্রচুর জন্মাত। তখন এ গ্রামের নারী-পুরুষ, ছেলে-বুড়ো, কিশোর-কিশোরী সকলে মূর্তা বেতদিয়ে ঘুমানোর জন্য চাটি, পাটি বানিয়ে হাট-বাজারে বিক্রি করতেন। মিহি বেত দিয়ে তৈরী পাটি কিংবা শীতলপাটি মানুষের কাছে ব্যাপক খ্যাতি লাভ করে। এক সময় কারুকার্য খচিত শীতলপাটির আরও বেশি কদর বেড়ে যায়। এক সময় ধুলিজোড়া গ্রামের সকলে শীতলপাটি তৈরীর কাজ করতেন। আর এ পাটি সিলেট জেলার বালাগঞ্জ বাজারে নিয়ে বিক্রি করতেন। সিলেট থেকে পাইকাররা এসে তাদের কাছ থেকে এগুলো কিনে নিয়ে শহর বন্দরে বিক্রি করতেন। এভাবে রাজনগরের ধুলিজোড়ার শীতলপাটি হয়ে গেছে বালাগঞ্জের শীতলপাটি। এ সব কথা জানিয়েছেন আইডিয়াল স্কুলের শিক্ষক আব্দুল আজিজ।
জানা যায়, ধুলিজোড়া গ্রামের অরুণ চন্দ্র দাস, প্রমেশ দাস, দ্বিজেন্দ্র দাস, শৈতেন্দ্র দাস, গোপাল দাস, সুশীল দাস, গোবিন্দ দাস, ধনজয় দাস, হরেন্দ্র দাস, নমিতা দাস, আরতি দাসসহ ১২-১৪ জননারী-পুরুষ অবসর সময়ে শীতলপাটি বানিয়ে বিক্রি করে থাকেন। ফলে পূর্ব পুরুষের ঐতিহ্যবাহী পেশা টিকে রয়েছে। ৬০-৬৫ বছর আগে গলিত মোন দাস নক্সা আকা শীতল পাটি বানানোর সেরা কারিগর ছিলেন। এখন অরুণ চন্দ্র দাস, আরতি দাস নক্সা অঙ্কিত শীতলপাটি ভাল কারিগর বলে জানান, স্থানীয় গীতেশ দাশ। ওই গ্রামের অরুণ চন্দ্র দাস এর বাড়িতে গেলে দেখা যায়, বাড়ির উঠানে কারুকার্য খচিত একখানা শীতলপাটি বানিয়ে রোদে শুকাতে দিচ্ছেন। আরও দু-খানা পাটির একখানা ভাজ করে বারান্দায় রেখেছেন। অন্য পাটিটি ভাজ করছেন। আরও দু’টি মাদুর বানিয়ে রেখেছেন। কথা প্রসঙ্গে তিনি জানান, ৪-৫ হাত বিশিষ্ট কারুকাজ করা একটা শীতল পাটি বানাতে ৩০-৩৫ দিন সময় লাগে। এর সাথে হাজার থেকে বারশ টাকার বেত ও রঙ লাগে। পালঙ্ক এর জন্য একটি নক্সা করা পাটি ২৮-৩০ হাজার টাকা দাম পড়ে। এ সব শীতলপাটি শৌখিন ধর্নাঢ্য ব্যক্তিবর্গ এখন ব্যবহার করেন। তিনি আরও জানান একটি সাধারণ মানের পাটি ৫-৬ হাজার টাকায় বিক্রি হয়ে থাকে। আগেকার দিনে বিয়ে-শাদীসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদি এবং গরমের দিন এলেই শীতলপাটি কেনা হত। এখন এ স্থান দখল করেছে চায়না প্রযুক্তির প্লাস্টিকের মাদুর। অরুণ চন্দ্র দাস জানান, সরকারি সহযোগিতায় শীতল পাটির কারিগর হিসেবে ২০১৩ সালে জাপানে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প মেলায় এবং ২০২৩ সালে চায়না গিয়ে ধুলিজোড়ায় বানানো শীতলপাটি প্রদর্শন ও বিক্রি হয়েছে।নক্সা আঁকা শীতলপাটি চীন ও জাপানে বেশসমাদৃত হয়েছে। এ সময় আমার সাথে হরেন্দ্র দাস ও গীতেশ দাস গিয়েছিলেন। এছাড়া প্রতিবছর নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে মাসব্যাপি (মাঘমাসে) কারুমেলায ও ২৭-২৯ ডিসেম্বর চারুকলায় শীতল পাটি নিয়ে অংশগ্রহণ করে থাকি।
অরুণ দাসের কলেজে পড়ুয়া মেয়ে মণিকা রাণী দাস জানান, ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটি কুটির শিল্পকে টিকিয়ে রাখার নিমিত্তে প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহারের জন্য উন্নত মানের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা। নতুবা গ্রাম বাংলার অতীত ঐতিহ্যের ধারক শীতলপাটি শিল্প অদূর ভবিষ্যতে হারিয়ে যাবে।






