ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (রহ.) ছিলেন দায়ী ইলাল্লাহ || হাফিজ সাব্বির আহমদ
প্রকাশিত হয়েছে : ১৫ জানুয়ারি ২০২৬, ৭:১৪ পূর্বাহ্ণ

হযরত আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (রহ.) ১৯১৩ ইং সালে সিলেটের জকিগঞ্জের বাদেদেওরাইল ফুলতলী গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত আলেম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ঊর্ধ্বতন পুরুষ হযরত শাহজালাল মুজাররাদে ইয়ামনী (রহ.) এর সফরসঙ্গী হযরত শাহ কামাল (রহ.) এর সাথে মিলিত হয়েছে। খান্দানিভাবে ওলি পরিবারের এই মহান বুযুর্গ দ্বীনের অপরিসমীম খেদমত আঞ্জাম দিয়ে ২০০৮ সালের ১৫ জানুয়ারি ইন্তেকাল হয়েছেন।
হযরত আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (রহ.) ছিলেন একজন দায়ী ইলাল্লাহ। বিংশ শতাব্দীজুড়ে ঊপনিবেশিক ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান আমল এবং স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে আপোষহীনভাবে দ্বীন প্রচার করে গেছেন। ইসলামি শরীয়ত ও তরিকতের তালিম-তালকিনে জীবনের মূল্যবান সময় ব্যয় করেছেন। কখনো ওয়াজের ময়দানে ঈমান আকিদা ও আমল-আখলাকের বয়ান করেছেন। কখনো খানকায় জিকির আজকার ও নসিহত পেশ করেছেন। আবার প্রয়োজনে বক্তৃতার মঞ্চে প্রতিবাদ-সংগ্রামে সোচ্চার হয়েছেন। ওয়ারাসুল আম্বিয়া হিসাবে সকল প্রকারের দায়িত্বই পালন করেছেন আল্লাহর এই মহান ওলি। দ্বীনের দরসগাহ মসজিদ মাদরাসা যেমন প্রতিষ্ঠা করেছেন তেমনই দ্বীনি আন্দোলনকে বেগবান করার জন্য সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছেন। দ্বীনহীন মানুষের মাঝে আল্লাহর দ্বীনকে উপস্থাপন করেছেন। দ্বীনের নামে ভন্ডামি জেহালতির বিরুদ্ধেও শক্তভাবে কথা বলেছেন।
মানবসেবায় হযরত ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ ছিলেন যুগের হাতেম তাঈ। নিজের সম্পদ, ঘরবাড়ি সবকিছুই মানুষের সেবায় উজাড় করে দিয়েছেন। এতিমদের লালন-পালন করেছেন। তাদের পরিবারের দেখাশুনার দায়িত্ব নিয়েছেন। এককথায় মানুষের ইহকালীন ও পরকালীন মুক্তির পথে তিনি ছিলেন মুরব্বির ভূমিকায়। ব্যক্তিগতভাবে তিনি মানুষকে সময় দিতেন এবং মানুষের কথা শুনতেন। বিপদগ্রস্থ মানুষের জন্য দোয়া করতেন এবং আর্থিকভাবে সাহায্য করতেন। তিনি সবসময় বলতেন- বড় বুযুর্গি হচ্ছে মানুষের সেবা করা। সেবার মাধ্যমে মানুষের বংশ উজালা হয়।
তরিকতের এই মহান বুযুর্গ চিরকাল শির উঁচু রেখে দ্বীনের খাদিমদারি করেছেন। কোন অপশক্তির কাছে এক সেকেন্ডের জন্যও মাথা নোয়াননি। পূর্বসূরীদের মতো জীবনে জেল-জুলমু, হুলিয়া, গ্রেফতারি পরোয়ানা সবকিছুই মুকাবিলা করেছেন। একজীবনে এই মণীষী সীমাহীন ত্যাগ ও সফলতার নজরানা রেখে গেছেন। বিনিময়ে দুনিয়াবি আরাম আয়েশ, ক্ষমতা কিছুই চাননি। চেয়েছেন দ্বীনের প্রচার ও প্রসার। জীবনভর করেছেন কুরআন ও হাদিসের খেদমত। হযরত ফুলতলী ছাহেবের দ্বীনি মেহনতের বদৌলতে কোটি কোটি মুমিন মুসলমান উপকৃত হয়েছেন। খোঁজে পেয়েছেন হেদায়াতের সরল পথ। তার কোন খেদমতই বিফলে যায়নি। আল্লাহর দরবারে সবকিছু কবুল হয়েছে। যেখানেই তার স্পর্শ লেগেছে সেখানেই সোনা ফলেছে। ফুলে ফুলে সুশোভিত হয়ে তা আজ শোভা ছড়াচ্ছে।

একসময় বাংলাদেশের সাধারণ মুসলমান এমনকি বেশিরভাগ আলেমদেরও কুরআন তেলাওয়াত সহিহ ছিলো না। আরবি হরফের হক, সিফত, মাখরাজ ও আওয়াজে গলদ ছিল। ফুলতলী ছাহেব দারুল কিরাত প্রতিষ্ঠা করে কুরআন শরীফ সহিহ করার মহান খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন। দারসে নেজামির সিলেবাসভুক্ত মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন যাতে দ্বীনের ফৌজ আলেম তৈরি হয়। গোমরাহি আকিদা থেকে মুসলমানদের বাঁচানোর জন্য দলিলভিত্তিক বয়ান করতেন। জিকির আমলের তাকিদ দিয়েছেন। গোনাহর কাজ থেকে বেঁচে থাকতে ও নেক আমলের পাবন্ধির জন্য সবসময় স্মরণ করিয়ে দিতেন। তিনি বলতেন, ‘মানুষের ঘরে জন্ম নিলেই মানুষ হওয়া যায় না। তাকে মানুষ হিসাবে গড়ে তুলতে হয়।’ ফুলতলী ছাহেব তরিকতের নামে কুরআন হাদিসের বাইরের কোন মনগড়া কথাকে প্রশ্রয় দিতেন না। সবসময় মানুষকে শরীয়তের গন্ডির ভেতর থাকার জন্য হুশিয়ার করতেন। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলতেন ‘শরীয়ত হল দুধের মতো আর তার শর হল তরীকত। দুধ ছাড়া যেমন শর হয় না তেমনি শরীয়ত ছাড়া তরীকত হয় না।’ ওয়াজের মাহফিলে সরাসরি কুরআন হাদিসের দলিল দিয়ে মানুষকে বুঝাতেন। মধ্যম আওয়াজে ওয়াজ করতেন। হযরত আদম আলাইহিস সালাম থেকে শুরু করে সকল নবী রাসুলের জিন্দেগী থেকে উদাহরণ পেশ করতেন। ইলমে তরিকত, ইলমে হাদিস ও ফেকাহর ইমামদের অত্যন্ত তাজিমের সাথে স্মরণ করতেন। আল্লাহর নেক বান্দা ও ওলিদের ব্যাপারে মানুষের চিন্তাধারাকে তিনি ইতিবাচকভাবে পরিবর্তন করেছেন। পাশাপাশি নবী রাসুলদের ছিদ্রান্বেষণকারী ও আউলিয়া বিদ্বেষীদের ব্যাপারে সতর্ক থাকার নসিহত করতেন। কথা বলার ক্ষেত্রে যা বলার পরিস্কার করে বলতেন। কথার মধ্যে কোন ধরনের গোজামিল থাকতো না। যে মাহফিলে যেতেন মানুষ আগে থেকেই কানায় কানায় পূর্ণ থাকতো। নওজোয়ানদের পাশাপাশি অনেক বয়স্ক ব্যক্তিরা মাহফিলে উপস্থিত হতেন। এর মধ্যে আলেমদের উপস্থিতি থাকতো চোখে পড়ার মতো। তিনি হাক্কানী আলেমদের স্নেহ ও সম্মান করতেন। আওলাদে রাসুলদের তাজিম করতেন। রাসুলের আজিম শান ও মানের প্রতি সামান্যতম অবহেলা, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য সহ্য করতে পারতেন না। খোদাদ্রোহী, নবী রাসুলদের দুশমনদের ব্যাপারে কঠোর ছিলেন। মুসলমানদের ইজ্জত আব্রুর উপর কোন ধরনের আঘাত আসলে ফুলতলী ছাহেব গর্জে উঠতেন। প্রতিবাদে সোচ্চার হতেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি যে আলেম প্রশস্থ ধারণা রাখতেন তিনি তাদের গুরুত্ব দিতেন ও স্নেহ করতেন। উৎসাতিহ করতেন। ছাহেবের বয়ানের একটি বৈশিষ্ঠ্য ছিল তিনি দীর্ঘক্ষণ বয়ান করতেন না। ঘণ্টাখানেক বয়ান করতেন। কিন্তু এই বয়ানের বরকত ছিল সময়ের কয়েকগুণ বেশি। ওয়াজের শেষে তিনি গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি নসিহত করতেন। তিনি বলতেন শান্তি মনে নামাজ পড়তে। যারা শান্তি মনে নামাজ পড়ে, ধীরস্থিরভাবে রুকু, সেজদা আদায় করে তাদের জীবন ততো সুন্দর হয়। অন্যের ভালো দেখলে মন খুশি রাখার তাকিদ দিতেন। তিনি বলতেন ‘যারা অন্যের ভালো দেখলে মন বেজার করে, তাদের দুনিয়া ও আখেরাতের ভরা ডুবে যায়।’ এছাড়া দমের জিকির করার জন্য তাকিদ করতেন। তিনি বলতেন, মুখ জিহবা না নেড়ে শ্বাস টান দিতে লা-ইলাহা, শ্বাস ফেলতে ইল্লাল্লাহর আমল করতে। এই আমল নিয়মিত সাধনা করলে এটা কলবে জারি হয়ে যাবে। যার ফলে মৃত্যুর সময় ঈমানের সাথে মৃত্যু নসিব হবে।
ফুলতলী ছাহেব প্রকৃত আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আকিদা-বিশ্বাস প্রচার করতেন। গোমরাহীর ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন ও সোচ্চার ছিলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি মানুষের প্রেম ও মোহাব্বাতকে জাগ্রত করতে মেহনত করেছেন। প্রতিটি মাহফিলে, খানকায় রাসুলের সিরাত বর্ণনা করতেন। মাহফিল শেষে দোয়া ও তওবা-বয়েত করাতেন। তাঁর উত্তম আখলাক, আমল ও বুযুর্গির কারণে মানুষ তাকে নিজেদের দ্বীনি অভিভাবক মনে করতেন। সরাসরি রাজনীতি না করলেও রাজনৈতিক নেতারা ভুল করলে বিশেষত ইসলাম ধর্মের ব্যাপারে কোন ধরনের আঘাত আসলে গর্জে উঠতেন। এইক্ষেত্রে কে কোন দলের তা পরোয়া করতেন না। আল হুব্বু ফিল্লাহ ওয়াল বুগধু ফিল্লাহর নীতিতে ছিলেন অটল।

তিনি পরিস্কার, পরিচ্ছন্ন ও মানানসই পোশাক-পরিচ্ছেদ পরিধান করতেন। অত্যন্ত সময় সচেতন ছিলেন। কিছুক্ষণ পরপর ঘড়িতে সময় দেখতেন। রাসুলের সুন্নাতের পাবন্দ আল্লাহর এই মহান ওলি নিজের জীবনকে রাসুলের আদর্শ ও আল্লাহর রঙে রঙিন করেছিলেন। তুলনামূলক অনেক বয়স হলেও দাওয়াহ’র কাজ এক মুহূর্তের জন্যও বন্ধ করেন নি।
প্রায় শত বছর হায়াতে জিন্দেগী পেয়েছিলেন তিনি। ইন্তেকালের পর প্রতিবছর ১৫ জানুয়ারি ফুলতলী ছাহেব বাড়িতে ঈসালে সাওয়াব উপলক্ষ্যে তাঁর লক্ষ লক্ষ মুরিদ, আশেক ও ভক্তরা জড়ো হোন। তার ওফাতের দিনকে কেন্দ্র করে সাওয়াবের উদ্দেশ্যে কুরআন শরীফ, বোখারি শরীফ, ওযিফাসহ বিভিন্ন ধরনের খতমের দোয়ায় শরীক হন। ছাহেব বাড়ির পক্ষ থেকে আগত মেহমানদের আপ্যায়ন করানো হয়। এছাড়া এদিন ছাহেব বাড়ির পক্ষ থেকে গরীব অসহায় মানুষের মধ্যে দান সাদকাহ করা হয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর এই নেক বান্দার খেদমতগুলোকে কবুল করুন এবং তাঁর দরজাকে আরো বুলন্দ করুন। আমিন।
হাফিজ সাব্বির আহমদ: পরিচালক, সিরাজাম মুনিরা জামে মসজিদ, বার্মিংহাম, ইউকে।





