চীনের অর্থায়নে মোংলা বন্দরে নির্মাণ হচ্ছে দুই অত্যাধুনিক কন্টেইনার জেটি
প্রকাশিত হয়েছে : 29 September 2026, 6:03 pm

ছবি: পূর্বদিক
খুলনা প্রতিনিধি: মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে চীনের অর্থায়নে দুইটি অত্যাধুনিক কন্টেইনার জেটি নির্মাণ করা হচ্ছে। আধুনিক যন্ত্রপাতিসহ এসব জেটি নির্মাণের পাশাপাশি কন্টেইনার ইয়ার্ড, বিপজ্জনক কার্গো হ্যান্ডলিং ইয়ার্ডসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে।
মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘মোংলা বন্দরের সুবিধাদির সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পটি ২০২৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদিত হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বন্দরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিপিং এজেন্ট, সিএন্ডএফ এজেন্ট, স্টিভেডরিং প্রতিষ্ঠান ও শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) খুলনাস্থ মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের অডিটোরিয়ামে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এসব তথ্য জানান মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা, এনইউপি, এনডিসি, এএফডব্লিউসি, পিএসসি।
চেয়ারম্যান জানান, প্রকল্পের আওতায় দুইটি কন্টেইনার জেটি নির্মাণ করা হবে, যার মোট দৈর্ঘ্য ৩৬৮ মিটার। এছাড়া ৮৭ হাজার ৬০০ বর্গমিটার লোডেড কন্টেইনার ইয়ার্ড, ৩৪ হাজার ১৭০ বর্গমিটার খালি কন্টেইনার ইয়ার্ড এবং ৪ হাজার ২৬০ বর্গমিটার বিপজ্জনক কার্গো হ্যান্ডলিং ইয়ার্ড নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে মোংলা বন্দরে বছরে ১ কোটি ৫০ লাখ টন কার্গো এবং ৪ লাখ টিইইউ কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করা সম্ভব হবে।
পশুর চ্যানেলে ড্রেজিং
বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, মোংলা বন্দরের পশুর চ্যানেলের নাব্যতা ধরে রাখতে পাঁচ বছর মেয়াদে চ্যানেলের বিভিন্ন স্থানে ৩৩০ দশমিক ৯০ লাখ ঘনমিটার সংরক্ষণ ড্রেজিং করা হবে। প্রকল্পের আওতায় জুন ২০২৬ পর্যন্ত ৫ লাখ ঘনমিটার ড্রেজিং কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
ড্রেজিং কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে মোংলা বন্দরের জেটি পর্যন্ত ৯ দশমিক ৫০ মিটার ড্রাফটের জাহাজ হ্যান্ডলিং করা সম্ভব হবে। এ প্রকল্পটি ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
ড্রেজার ও মুরিং বোট সংগ্রহ
অনুমোদন প্রক্রিয়াধীন প্রকল্প সম্পর্কে চেয়ারম্যান বলেন, একটি ন্যূনতম ৩ হাজার ৫০০ কিউবিক মিটার ধারণক্ষমতার ট্রেইলিং সাকশন হপার ড্রেজার, দুইটি ২৮ ইঞ্চি কাটার সাকশন ড্রেজারসহ আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া পশুর চ্যানেলে নদীশাসনের জন্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং দুইটি মুরিং বোট সংগ্রহ করা হবে।
সহায়ক জলযান সংগ্রহের প্রকল্প
চলমান প্রকল্পের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বন্দরের জন্য সহায়ক জলযান সংগ্রহ (প্রথম সংশোধিত)’ প্রকল্পের আওতায় সমুদ্রগামী জাহাজ সুষ্ঠু ও দক্ষতার সঙ্গে হ্যান্ডলিংয়ের জন্য বিভিন্ন ধরনের জলযান সংগ্রহ করা হচ্ছে।
এর মধ্যে দুইটি টাগবোট, একটি বয়া লেইং ভেসেল, একটি সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ ভেসেল, একটি পাইলট মাদার ভেসেল এবং একটি সার্ভে অ্যান্ড রিসার্চ ভেসেল সংগ্রহের কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নিরাপদ চ্যানেল তৈরি, সমুদ্রগামী জাহাজ সুষ্ঠুভাবে হ্যান্ডলিং এবং দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় জরুরি উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হবে। প্রকল্পটি ২০২৭ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
ভারতীয় অর্থায়নেও কন্টেইনার টার্মিনাল
মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভারতীয় এলওসি-৩-এর অর্থায়নে ‘আপগ্রেডেশন অব মোংলা পোর্ট’ শীর্ষক একটি প্রকল্পও বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় আধুনিক যন্ত্রপাতিসহ দুইটি কন্টেইনার টার্মিনাল, কন্টেইনার হ্যান্ডলিং ইয়ার্ড ও কন্টেইনার ডেলিভারি ইয়ার্ড নির্মাণসহ বিভিন্ন সুবিধা সৃষ্টি করা হবে।
বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে মোংলা বন্দরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিপিং এজেন্ট, সিএন্ডএফ এজেন্ট, স্টিভেডরিং প্রতিষ্ঠান এবং শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে।
এক বছরে ৮১৫ জাহাজ
২০২৫-২৬ অর্থবছরের পরিসংখ্যান তুলে ধরে আরিফ আহমেদ মোস্তফা বলেন, ওই অর্থবছরে মোংলা বন্দরে মোট ৮১৫টি জাহাজ এসেছে। এ সময় কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯১ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন। এর বিপরীতে ১ কোটি ২২ লাখ ৫১ হাজার মেট্রিক টন কার্গো হ্যান্ডলিং হয়েছে। যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৮ লাখ ৩৯ হাজার মেট্রিক টন বা ১৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ বেশি।
কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৫ হাজার টিইইউ। এর বিপরীতে ২৯ হাজার ৭১৪ টিইইউ কন্টেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় এ ক্ষেত্রে ৮ হাজার ২৫৮ টিইইউ বা ৩৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ বেশি কন্টেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে।
রাজস্ব আয় বেড়েছে
বন্দর চেয়ারম্যান জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৪৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। এর বিপরীতে ৩৮৭ কোটি ৯৫ লাখ ১২ হাজার টাকা রাজস্ব আয় হয়েছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় রাজস্ব আয় বেড়েছে ৪০ কোটি ৮২ লাখ ৬৪ হাজার টাকা বা ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ।
তিনি আরও জানান, ওই অর্থবছরে মোংলা বন্দরের মাধ্যমে ১২ হাজার ৭৫টি রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানি হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৪৯৬টি বেশি।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হারবার ও মেরিন) কমডোর মো. শফিকুল ইসলাম সরকার, সদস্য (প্রকৌশল ও উন্নয়ন) (দায়িত্বপ্রাপ্ত বিকল্প কর্মকর্তা) প্রকৌশলী শেখ শওকত আলী, প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা কালাচাঁদ সিংহ, পরিচালক (বোর্ড) কমান্ডার এস এম আফজালুল ইসলাম, হারবার মাস্টার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম, উপপরিচালক (জনসংযোগ) মো. সালাহ্ উদ্দিন কবির, খুলনা প্রেস ক্লাবের সভাপতি মোস্তফা সরওয়ার, সাধারণ সম্পাদক তরিকুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
পূর্বদিক/এসএ





