চাকুরি হারিয়ে এখন সফল বরই চাষি গিয়াস উদ্দিন
প্রকাশিত হয়েছে : ২৪ নভেম্বর ২০২৫, ১২:৪২ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক ::
বরই চাষই ভাগ্য বদলে দিয়েছে রাজনগরের গিয়াস উদ্দিনের। মাত্র ৫ বছরের চেষ্টায় এখন তিনি সফল বরই চাষী। থাই আপেল কুল এবং রেড আপেল কুল বাড়াছে আয়। এখন জমির আয়তন বৃদ্ধি করেছেন। রপ্ত করে নিয়েছেন চাষের খুটিনাটি। তার কথা চেষ্টা, পরিকল্পনা এবং আল্লাহর উপর ভরসাই এই সাফল্যের চাবিকাটি। এখন বছরে কয়েক লক্ষ টাকা আয় তার এই বরই বাগান থেকেই। এবারও ভাল আয় হবে বলে তার আশা।
গিয়াস উদ্দিনের বাড়ি মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার একামধু গ্রামে। তিন সন্তানের জনক গিয়াস এক সময় চাকুরী করতেন বিডিআর এ। পিলখানা হত্যাকান্ডের পর চাকুরি হারান। তার কথায় যদিও কোন অপরাধ ছিল না তার। তাই প্রসঙ্গ উঠতেই দু’হাত তুলে মহান আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ জানান। চাকুরি হারিয়ে শূন্যহাতে বাড়ি ফিরে যখন দুচোখে অন্ধকার দেখছিলেন তখন পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া জমিতে পূর্ব কৃষি কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে শাক-শবজি চাষ শুরু করেন। জমির উর্বরতা দেখে পাশাপাশি ফল চাষের প্রতি তার আগ্রহ তৈরি হয়। জানান, চাকুরীর সুবাদে দেশের বিভিন্ন জায়গায় যাওয়ার সুযোগ হয়। সেই সুবাদে ফলের বাগান দেখে মনে সুপ্ত বাসনা তৈরি হয় সুয়োগ হলে নিজের জমিতে ফলের বাগান করার। সুযোগ করে দেয় চাকুরী হারানোর কারণ। ২০১৯ সালে মনু নদীর ঠিক তীরের নিকটে প্রথম এক কিয়ার (৩০ শতক) জমিতে জুন মাসে আপেল কুল ও বলসুন্দরী জাতের ২০০ বরই চারা যশোহর থেকে এনে জমিতে লাগান। আর এই চারা লাগাতে খরচ হয় ৪০ হাজার টাকা। প্রায় সাত মাস পরিচর্যার পর গাছে বরই ধরা শুরু করে। প্রথম বছর প্রতি গাছে নিম্নে তিন কেজি উর্ধ্বে ১ মন পর্যন্ত ফলন আহরণ করা গেছে। প্রতি কেজি ১০০ থেকে ১২০ টাকা দরে বিক্রি হয়। শুক্রবার (২১ নভেম্বর) বরই বাগান দেখতে গেলে গিয়াস উদ্দিন জানান, বরই চাষে লাভ হওয়ায় এখন বাগানের আয়তর বাড়ানো হয়েছে। ৪ কিয়ার জমিতে এখন আছে ৪৫০টি বরই গাছ। সবকটি গাছেই ফলন হয়েছে। এক কিয়ার নিজের জমি হলেও বাকি ৩ কিয়ার অন্য মালিকের। প্রতি কিয়ার বছর চুক্তি ৩০ হাজার টাকায় নিয়েছেন। বাগান ঘুরে দেখানোর ফাঁকে গিয়াস জানান, মাঝে ড্রাগন, স্ট্রবেরি চাষ করেছেন। তবে লাভ দেখছেন মূলত বরই চাষেই। এখন বাগানে পাঁচ জাতের বরই আছে। এর মধ্যে থাই আপেল কুল, রেড আপেলকুল, অস্ট্রেলিয়ান আপেল কুল, টক মিষ্টি চায়না, টক মিষ্টি গোল্ডেন ইত্যাদি। তার কথা এই বরইগুলোর মধ্যে কোন জাতের বরই ১৮/১৯ টিতে এক কেজি ওজন হয়ে যায়। তবে পরিবারের পুষ্টির চাহিদা মেটাতে বাগানে ১২ টি বারোমাসি আম গাছ লাগিয়েছেন।
গিয়াস উদ্দিন আরো জানান, বরই বহু বর্ষজীবী তাই প্রতি বছর ফলন পাওয়া যায়। নিয়মিত পরিচর্যা করতে হয়। অপ্রয়োজনীয় ডাল, কুড়ি পাতা ভেঙ্গে দিতে হয় যাতে ফল নিয়মিত সূর্যের আলো পায়। ঠিকমতো পুষ্টি পায়। আবার ফল যখন পাকার সময় আসে সেই সময় পাখির আক্রমন থেকে বাচাতে গাছ নেট দিয়ে ঢেকে দিতে হয়। পোকা মাকড়ের আক্রমন থেকে বাচিয়ে রাখতে ঔষধ দিতে হয়। গিয়াস উদ্দিন জানান প্রতি বছর ২ থেকে আড়াই লক্ষ টাকা বাগানে শ্রমিক ও অন্যান্য খরচ বাবত ব্যয় হয়। আয় বছরে ৫ লক্ষ টাকার অনেক বেশি হয়। কিন্তু প্রকৃত আয়ের টাকার পরিমান বলতে চান না। কারণ হিসাবে বলেন মানুষ হিংসা করে। তবে এই বরই চাষ করে নতুন পাকা বাড়ি করেছেন। স্বচ্ছল জীবন যাপন করছেন। এই বরই বাগানে কামলার কাজ করেন পাশ্ববর্তি গ্রামের একলাছুর মিয়া (৬৬)। প্রতি দিন ৬০০ টাকা পান। সিজনে আরো কয়েকজন কাজ করেন। জানান কার্তিক মাসে গাছে ফুল আসে। অগ্রহায়ণ মাস থেকে মাঘ মাস পর্যন্ত বরই ফসল তোলে বিক্রি করা হয়। ফসল তোলার পর ডাল ছাটাই করে দিতে হয়। নদীর কাছে যে বছর পলি পড়ে সেই বছর ফলন আরো ভাল হয়।
গিয়াস উদ্দিনের ক্ষোভ আছে কিছুটা স্থানীয় কৃষি বিভাগের কর্মকর্তার উপর। জানান উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তাকে ফোন দিলে বা যোগাযোগ করলে খুব কম সহযোগিতা পাওয়া যায়। অনেক সময় ফোনই তুলেন না।





