মা: নিঃস্বার্থ ভালোবাসার অনন্ত ঠিকানা
প্রকাশিত হয়েছে : ১০ মে ২০২৬, ১১:৫০ পূর্বাহ্ণ

এআই প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি প্রতীকী ছবি।
রুপম আচার্য্য: মানুষের জীবনে সবচেয়ে গভীর, সবচেয়ে নির্মল এবং সবচেয়ে নিরাপদ সম্পর্কের নাম মা। পৃথিবীর সব ভাষা, সব সাহিত্য কিংবা সব অনুভূতি এক করলেও “মা” শব্দটির প্রকৃত ব্যাখ্যা দেওয়া কঠিন। কারণ মা শুধু একটি শব্দ নয়, এটি এক অশেষ মমতা, এক নির্ভরতার ছায়া এবং নিঃস্বার্থ ভালোবাসার প্রতীক।
একজন সন্তান পৃথিবীতে আসার আগ থেকেই মায়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। দশ মাস দশ দিন সন্তানকে গর্ভে ধারণ করে একজন মা যে কষ্ট সহ্য করেন, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। নিজের শারীরিক যন্ত্রণা, মানসিক চাপ এবং হাজারো প্রতিকূলতার মাঝেও একজন মা শুধু একটি স্বপ্নই দেখেন—তার সন্তান সুস্থভাবে পৃথিবীর আলো দেখুক।
সন্তান জন্মের পর শুরু হয় মায়ের নতুন সংগ্রাম। রাতের পর রাত না ঘুমিয়ে সন্তানের দেখাশোনা, নিজের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে বিসর্জন দেওয়া, সন্তানের মুখে এক চিলতে হাসি ফোটাতে নিজের সবটুকু উজাড় করে দেওয়া—এসবই একজন মায়ের প্রতিদিনের গল্প। একজন মা কখনো নিজের ক্লান্তির কথা ভাবেন না; সন্তানের সুখেই তিনি নিজের শান্তি খুঁজে পান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন শিশুর মানসিক ও সামাজিক বিকাশে মায়ের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর প্রথম শিক্ষা শুরু হয় মায়ের কাছ থেকেই। কথা বলা, আচরণ শেখা, ভালো-মন্দ বোঝা—সবকিছুর ভিত্তি তৈরি হয় মায়ের হাত ধরে। একজন মায়ের স্নেহ, ভালোবাসা ও শিক্ষা একটি শিশুর ভবিষ্যৎ গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, একটি পরিবারকে টিকিয়ে রাখার মূল শক্তি হচ্ছেন মা। পরিবারের সবার সুখ-দুঃখ, প্রয়োজন এবং সম্পর্কের ভারসাম্য একজন মা নিঃশব্দে সামলে রাখেন। পরিবারের প্রতিটি সদস্যের যত্ন নিতে গিয়ে তিনি নিজের অনেক ইচ্ছাকেও বিসর্জন দেন। অথচ বিনিময়ে খুব বেশি কিছু চান না—সন্তানের ভালো থাকা আর সামান্য ভালোবাসাই তার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
বর্তমান সময়ে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যস্ত জীবনে অনেক সন্তানই মায়ের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ কম পাচ্ছেন। কর্মব্যস্ততা, দূরত্ব কিংবা জীবনের নানা চাপে অনেক সময় মায়ের প্রতি দায়িত্ববোধ প্রকাশে অনীহা দেখা যায়। তবে বাস্তবতা হলো, একজন মা সন্তানের কাছ থেকে দামী উপহার নয়, বরং একটু সময়, একটু খোঁজখবর এবং আন্তরিক ভালোবাসাই সবচেয়ে বেশি প্রত্যাশা করেন।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও মায়ের মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। ইসলাম ধর্মে মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত বলা হয়েছে। অন্য ধর্মগুলোতেও মাকে শ্রদ্ধা ও সম্মানের সর্বোচ্চ স্থানে রাখা হয়েছে। কারণ একজন মা শুধু সন্তান জন্ম দেন না, তিনি একটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে তোলেন।
বিশ্বসাহিত্যে মাকে নিয়ে অসংখ্য কবিতা, গল্প ও গান রচিত হয়েছে। কবি, সাহিত্যিক ও শিল্পীরা বারবার মায়ের ভালোবাসাকে পৃথিবীর সবচেয়ে বিশুদ্ধ অনুভূতি হিসেবে তুলে ধরেছেন। কারণ মায়ের ভালোবাসায় কোনো স্বার্থ নেই, নেই কোনো ভান।
সন্তানের জন্য একজন মা নিজের জীবন পর্যন্ত ত্যাগ করতে দ্বিধা করেন না। অনেক সময় মানুষ জীবনের ব্যস্ততায় মায়ের মূল্য বুঝতে দেরি করে ফেলে। কিন্তু যখন মা দূরে চলে যান, তখন তার শূন্যতা প্রতিটি মুহূর্তে অনুভূত হয়। মায়ের হাতের খাবার, মমতার স্পর্শ কিংবা শাসনের আড়ালের ভালোবাসা তখন স্মৃতির গভীরে কাঁদায়।
মা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ উপহার। একজন সন্তানের জীবনে মা-ই সবচেয়ে বড় সাহস, সবচেয়ে বড় প্রেরণা এবং সবচেয়ে নির্ভরতার আশ্রয়। তাই শুধু বিশেষ কোনো দিনে নয়, প্রতিদিনই মায়ের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও যত্ন প্রকাশ করা উচিত।
কারণ পৃথিবীর সব ভালোবাসা বদলে যেতে পারে, কিন্তু মায়ের ভালোবাসা কখনো বদলায় না। মা আছেন বলেই পৃথিবী এত সুন্দর, এত মায়াময়।
রুপম আচার্য্য, সাংবাদিক, ডেইলি অবজারভার ও দৈনিক জাতীয় অর্থনীতি





