ঝুট কাপড়ের পাপোশে বদলে যাচ্ছে জীবন, কর্মসংস্থান হচ্ছে বেকার যুবক-নারীদের
প্রকাশিত হয়েছে : 6 September 2026, 11:03 pm

ছবি: পূর্বদিক
নিজস্ব প্রতিবেদক: আশুলিয়ার পোশাক কারখানাগুলো থেকে ফেলে দেওয়া ঝুট কাপড় এখন আর বর্জ্য নয়; বরং তা হয়ে উঠেছে বহু পরিবারের আয়ের উৎস। সাভারের আশুলিয়ার কবিরপুর এলাকায় পোশাক কারখানার পরিত্যক্ত ঝুট কাপড় দিয়ে তৈরি হচ্ছে পাপোশ, কার্পেটসহ নানা ধরনের গৃহসামগ্রী। ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা এসব ছোট ছোট কারখানায় কর্মসংস্থান হয়েছে বেকার যুবক-যুবতীদের। পাশাপাশি ঘরে বসে কাজের সুযোগ পেয়েছেন অনেক নারী।
স্থানীয়রা জানান, আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে ছোট-বড় সহস্রাধিক পোশাক কারখানা রয়েছে। এসব কারখানায় পোশাক তৈরির পর বিপুল পরিমাণ কাপড়ের টুকরা বা ঝুট জমা হয়। একসময় এসব ঝুট ফেলে দেওয়া হতো কিংবা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হতো। বর্তমানে সেই অব্যবহৃত কাপড় পুনর্ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে বাহারি নকশা ও রঙের পাপোশ, কার্পেটসহ মেঝেতে ব্যবহারের বিভিন্ন সামগ্রী।
কবিরপুর এলাকায় একসময় অনেক মানুষ বেকার জীবনযাপন করলেও পাপোশ তৈরির কারখানা গড়ে ওঠার পর তাঁদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও এ কাজে যুক্ত হয়েছেন। অনেকে কারখানায় কাজ শিখে এখন বাড়িতে বসেই পাপোশ তৈরি করছেন। এতে সংসারের আয় বাড়ার পাশাপাশি নিজেদের প্রয়োজনীয় খরচও মেটাতে পারছেন তাঁরা।
সরেজমিনে কবিরপুর এলাকার পাপোশ তৈরির কয়েকটি কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, শ্রমিকরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। বিভিন্ন রঙের কাপড়ের ছোট ছোট টুকরা দিয়ে নকশা বুনে তৈরি করা হচ্ছে বিভিন্ন আকারের পাপোশ। অনেকেই পড়াশোনা বা অন্য কাজের পাশাপাশি বাড়তি আয়ের জন্য পিস হিসেবে মজুরিতে কাজ করছেন। গৃহস্থালির কাজের ফাঁকে নারীরাও ঘরে বসে এ কাজ করছেন।
উদ্যোক্তাদের হিসাবে, পোশাক কারখানা থেকে প্রতি টন ঝুট কাপড় গড়ে ২৭ হাজার টাকায় কিনতে হয়। পাপোশের আকার, আয়তন ও নকশাভেদে কারিগরদের প্রতি পিস ৮ থেকে ৩৫ টাকা পর্যন্ত মজুরি দেওয়া হয়। আনুষঙ্গিক খরচসহ এক টন ঝুট কাপড় থেকে গড়ে প্রায় ১ হাজার ৫০০টি পাপোশ তৈরি করা যায়। এসব পাপোশ বিক্রি করে প্রতি টনে প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা মুনাফা থাকে। একজন দক্ষ কারিগর প্রতিদিন গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন।
কবিরপুরের পাপোশ তৈরির উদ্যোক্তা শামীম বলেন, একসময় পোশাক কারখানার টুকরা কাপড় স্তূপ হয়ে পড়ে থাকত। দারিদ্র্যের কারণে তিনি একসময় ভারতে গিয়ে ঝুট কাপড় দিয়ে পাপোশ তৈরির একটি কারখানায় কাজ করেন। পরে নিজ জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে একই কাজ শুরু করেন। তবে সেখানে গার্মেন্টস কারখানা না থাকায় ঢাকা থেকে ঝুট কাপড় কিনে পরিবহন খরচ বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে পরে শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ায় এসে কারখানা গড়ে তোলেন তিনি। বর্তমানে আশুলিয়ার বিভিন্ন এলাকায়, বিশেষ করে কবিরপুরে, এ ধরনের অনেক কারখানা গড়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, প্রথমে পাঁচটি তাঁত দিয়ে কারখানার যাত্রা শুরু করি। দক্ষ কারিগর না থাকায় আশপাশের বেকার যুবকদের ডেকে এনে কাজ শেখাই। শুরুতে নোংরা-ময়লা কাপড় দেখে অনেকেই কাজ করতে চাইত না। পরে প্রতিদিনের আয় হাতে পেয়ে তারা এ কাজে আগ্রহী হয়ে ওঠে।
শামীমের কারখানায় বর্তমানে ২৫টি তাঁত রয়েছে। প্রতিদিন গড়ে সাড়ে ৩৫০টির বেশি পাপোশ তৈরি হয়। কারিগর, সহকারী ও অন্যান্য কর্মচারী মিলিয়ে সেখানে প্রায় ৫০ জন কাজ করছেন। তাঁদের প্রত্যেকে নকশা ও কাজের ধরন অনুযায়ী দৈনিক গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় করেন।
শামীম আরও বলেন, এই কারখানার মাধ্যমে স্থানীয় বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান হয়েছে। পাশাপাশি নারীদেরও ঘরে বসে কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ঝুট কাপড় পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ছে।
কারখানার কারিগর মানিক মিয়া বলেন, কলেজে পড়াশোনার পাশাপাশি এখানে কাজ শিখেছি। এখন এই কাজ করে পড়াশোনার খরচের পাশাপাশি পরিবারের ছোটখাটো চাহিদাও মেটাতে পারছি। হাতখরচের জন্য বাবার কাছে টাকা চাইতে হয় না। তবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে মজুরি বাড়ানো প্রয়োজন।
স্থানীয়দের মতে, পোশাক কারখানার ফেলে দেওয়া ঝুট কাপড় পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে একদিকে যেমন পরিবেশের ওপর চাপ কমছে, অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ। সরকারি ও বেসরকারি সহযোগিতা পাওয়া গেলে এ খাত আরও সম্প্রসারিত হয়ে বেকার যুবক ও নারীদের জন্য বড় ধরনের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।
পূর্বদিক/এসএ





