নবীর মিলাদে খুশি হওয়া কুরআনিক নির্দেশ ll মাওলানা বদরুজ্জামান রিয়াদ
প্রকাশিত হয়েছে : ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ৪:০৩ অপরাহ্ণ

মাওলানা বদরুজ্জামান রিয়াদ::
মাহে রবিউল আউয়াল সকল মুমিন মুসলমানের কাছে অত্যন্ত প্রিয় ও সম্মানিত একটি মাস। এ মাসের ১২ তারিখ পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে আনন্দজনক ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল। দেড় হাজার বছর পূর্বে এ দিনে মা আমেনার কোলজুড়ে নূর নবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সমস্ত পৃথিবীকে আলোকিত করেছিলেন। দ্যুলোকে-ভূলোকে, গ্রহ-নক্ষত্রে, আকাশে-বাতাসে খুশীর হিল্লোল বয়ে গিয়েছিল। এ ব্যাপারে ইমাম আবূ হাতিম মুহাম্মদ ইবনু হিব্বান (র.) তার ‘ছিকাত’ নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন- ‘নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হস্তির বছর রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ সোমবার জন্মগ্রহণ করেন। [জামিউল আছার ২/৫৬৭]
নবি পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মে খুশি প্রকাশ করা যা আমাদের কাছে ‘ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)’ হিসেবে পরিচিত। এটা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অবশ্য কর্তব্য।আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন ‘(হে রাসূল!) বলুন, এটা হয়েছে আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর দয়ায়। সুতরাং এতে তারা যেনো আনন্দিত হয়। এটিই উত্তম সে সমুদয় থেকে, যা তারা সঞ্চয় করেছে। [সূরা ইউনুস: ৫৭, ৫৮]
অত্র আয়াতের তাফসিরে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত আছে- ফাদ্বলুল্লাহ (আল্লাহর অনুগ্রহ) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ইলম এবং রাহমাতুহু (তাঁর দয়া) দ্বারা উদ্দেশ্য মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম৷ কেননা, আল্লাহ তায়ালা অন্যত্র (নবিকে রহমত আখ্যা দিয়ে) ইরশাদ করেছেন (হে রাসুল!) আমি আপনাকে কেবল রহমত স্বরূপ প্রেরণ করেছি। [আদ্দুররুল মানসূর: ৭/৬৬৭]
আয়াতে আল্লাহ পাক নবীজির কারণে আমাদেরকে খুশি উদযাপন করতে বলেছেন। আর খুশি উদযাপনের অপর নাম ঈদ। অতএব প্রমাণিত হলো যে, নবীর মিলাদে বা জন্মের কারণে খুশি হওয়া কুরআনিক নির্দেশ।
আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী র. (মৃ. ৯১১ হি.) বলেন নবী পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মিলাদে আমাদের সম্মিলিত হয়ে শুকরিয়া প্রকাশ করা, খাদ্য খাওয়ানো, অন্যান্য নেক আমল এবং খুশি প্রকাশ (ঈদ উদযাপন) করা মুস্তাহাব। [আল-হাবী লিলফাতাওয়াহ: ১/১৮৮]
ঈদে মিলাদুন্নবীর উদ্দেশ্য হলো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবনী ও তাঁর শানে প্রশংসা বাণী শোনা। তাঁর প্রতি দুরূদ ও সালাম পাঠ, গরীবকে খানা খাওয়ানো এবং নবি প্রেমিকদের অন্তরে আনন্দ দেওয়া। হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় আগমন করার পর ইহুদীদেরকে আশুরার রোযা পালন করতে দেখলেন। তিনি তাদেরকে বললেন, এটা কোন দিন যাতে তোমরা রোযা পালন করছো? তারা বললো, এটা মহান দিন। এদিনে আল্লাহ তায়ালা মূসা আলাইহিস সালাম ও তার কওমকে মুক্তি দেন এবং ফেরাউন ও তার কওমকে ডুবিয়ে মারেন। তখন মূসা আলাইহিস সালাম শুকরিয়া হিসেবে রোযা রেখেছিলেন, তাই আমরাও রোযা রাখি। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, মূসা আলাইহিস সালাম এর ব্যাপারে তোমাদের চেয়ে আমরা বেশী হকদার। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোযা রাখলেন এবং (সাহাবায়ে কেরামকে) রোযা রাখার আদেশ করলেন। [মুসলিম: ২৭১৪]
এ হাদিস থেকে ইবনে হাজার আসকালানী (র.) (মৃ. ৮৫২ হি.) একটি মূলনীতি উদ্ভাবন করেছেন। আর তা হলো কোনো নির্ধারিত দিনে বিশেষ কোনো নেয়ামত পেলে ঐ দিনে এবং তার পরবর্তিতে শুকরিয়া প্রকাশে কিছু করা যাবে। তাই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামক মহা-নিয়ামত প্রাপ্তির কারণে আমরা উক্ত দিনে প্রতি বছর শুকরিয়া প্রকাশ করে থাকি। আর আল্লাহর শুকরিয়া সাজদা, রোযা, সাদকাহ, তেলাওয়াত ইত্যাদির মাধ্যমে হয়ে থাকে। হাদিস শরীফে আছে, হযরত আনাস (রা.) বলেন নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবুয়্যাত প্রাপ্তির পর নিজের পক্ষ থেকে আকীকা করেন। [মুসনাদু বাযযার: ৬২০৩]
জালালুদ্দীন সূয়ুতী (র.) এ হাদিস থেকে একটি মূলনীতি উদ্ভাবন করেছেন। আর তাহলো মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দাদা বাল্যকালে তাঁর আকীকা করেছিলেন। আর আকীকার পূণরাবৃত্তি হয় না। তাই বুঝা যায়, এটা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ শুকরিয়া প্রকাশের জন্য করেছিলেন যে আল্লাহ তায়ালা তাঁকে সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং আমাদের জন্য মুস্তাহাব হবেÑ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মের শুকরিয়া প্রকাশের জন্য বন্ধু-বান্ধবদের একত্র করে খানা খাওয়ানো।

হযরত উরওয়া (রা.) বলেন আর সুয়াইবা (রা.) ছিলেন আবূ লাহাবের দাসী। আবূ লাহাব তাকে আযাদ করেছিলো। অতঃপর তিনি (সুয়াইবা) মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দুধ পান করিয়েছিলেন। আবূ লাহাব মারা গেলে তার পরিবারের কোনো একজনকে (কাসতাল্লানী বলেন, তিনি হলেন হযরত আব্বাস (রা.) খুব খারাপ অবস্থায় দেখানো হলো। তিনি তাকে বললেন তুমি কী সাক্ষাত করেছো? আবূ লাহাব বললো, তোমাদের পরে আমি ভালো কিছুর সাক্ষাত করিনি, তবে আমি সুওয়াইবাকে আযাদ করার কারণে এ আংগুলি দ্বারা পানি পাই। [বুখারি: ৪৮১৩]
হাফেজ শামসুদ্দীন জাজরী (র.) বলেন, আবূ লাহাব মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্মে খুশি হয়ে আংগুলির ইশারায় দাসি আযাদ করার কারণে কবরে তাকে উক্ত আংগুলি দিয়ে পানি পান করতে দেয়ার ঘটনা সহিহ সূত্রে বর্ণিত আছে। আর আবূ লাহাব যদি কাফের হয়ে এ ফল পায় তবে মুমিন ব্যক্তি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জন্মে খুশি হলো অবশ্যই আরো সুন্দর ফল পাবে।
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের জন্মদিনকে নিজে তাযীম করে সোমবারে রোযা রাখতেন। যেমন, হযরত আবূ কাতাদা আনসারী (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে সোমবার রোযা রাখা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি উত্তরে বললেন, এদিনে আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এই দিনেই আমার প্রতি (নবুয়্যাত বা কুরআন) নাযিল করা হয়েছে। [মুসলিম: ১৯৭৮]
তাই তাযিমের সূরত যদিও ভিন্ন। কিন্তু উক্ত দিনকে উদযাপনের আসল বা মূলনীতি পাওয়া গেলো। চাই উক্ত উদযাপন খাবার খাওয়ানো, জিকির, দুরূদ পাঠ বা অন্য যে কোনো হালাল মাধ্যমেই হোক না কেন? মিলাদের মাধ্যমে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর গুণ বর্ণনা করে আমরা তাঁর কিছু হক আদায়ের চেষ্টা করতে পারি। সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে যারা কবি ছিলেন, তাঁরা অনেক সময় তার প্রশংসামুলক কবিতা বলার মাধ্যমে তাঁর রেজামন্দী অর্জন করতেন এবং দোয়া লাভ করতেন। আমরাও তারা গুণাবলী, জীবন বৃত্তান্ত আলোচনা করে তার মহব্বত অর্জন করতে পারি।
[সংক্ষেপিত]





