সর্বজনীন রাসূল মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ll মো. সাইফুল ইসলাম
প্রকাশিত হয়েছে : ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ৪:১১ অপরাহ্ণ

মো. সাইফুল ইসলাম::
পথহারা একটি জনগোষ্ঠী, জাতি বা গোত্রের পথপ্রদর্শক হিসেবে তাদের মধ্য থেকেই নবি-রাসুল প্রেরিত হন। একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবন-প্রণালি অবলম্বন করেই তাঁরা বেড়ে উঠেন। মহৎ কর্মগুণে লাভ করেন সমকালীন জনসমাজে শ্রেষ্ঠ মানবের স্বীকৃতি। সে সর্বোত্তম মানবের কাছ থেকেই স্বীয় সম্প্রদায়ের কাছে আসে সৃষ্টিকর্তার এককত্ব ও সার্বভৌমত্বের ঘোষণা। পয়গম্বরত্ব আরোপের সাথে সাথে লাভ করেন মুজিজা বা অলৌকিক ক্ষমতা। যুগের সাথে সামঞ্জস্য রেখেই দান করা হত এসব অপার্থিব ক্ষমতা। যাতে সমকালীন কওমরা তাঁকে সহজেই আল্লাহ প্রেরিত বার্তাবাহক হিসেবে অনুধাবন করতে পারে। মুসা নবির যুগে জাদুবিদ্যার প্রাধান্য ছিল। তাই তাঁকে এমন এক মুজিজা দেওয়া হল তাতে সমকালীন জাদুকররা পর্যন্ত হতবাক হয়ে তাঁকে আল্লাহ প্রেরিত পয়গম্বর হিসেবে মেনে নিল। ঈসা আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে চিকিৎসা বিদ্যার প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়েছিল। তাই যুগের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর অধিকাংশ মুজিজাগুলো ছিল রোগ নিরাময় সংক্রান্ত। এমন কি মৃত মানুষকে জীবিত করার মত ঐশী ক্ষমতাপ্রাপ্ত হন। যেটা সাধারণ মানুষতো বটেই, চিকিৎসকের কাছেও ছিল অসম্ভব ব্যাপার। মহানবি মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগ ছিল শিল্প-সাহিত্যের উৎকর্ষের যুগ। তাঁর উপর নাযিলকৃত মহাগ্রন্থ আল কুরআনের ভাষা-সুষমা, অভ্যন্তরীণ সুর-ছন্দ ছিল সমকালীন সাহিত্যকর্মের চেয়ে উন্নততর। ফলে কবি-বোদ্ধারা একে ঐশীবাণী বলে মেনে নেন।
কোন নির্দিষ্ট গোত্র বা সম্প্রদায়ের জন্য নয়, সমকালীন ও তৎপরবর্তী সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রেরিত একমাত্র রাসুল মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। যে কোন স্থান, কালের মানদণ্ডে তিনি মহামানব, নৈতিক চরিত্রের এক পরাকাষ্ঠা। তাঁর জীবনালেখ্য নির্মাণ শুরু করা যায়, শেষ করা যায় না। যুগে যুগে তাঁর জীবনী রচিত হবে সে যুগের চাহিদা ও সমস্যার আলোকে। তাঁর জীবন ও কর্ম থেকে সমাধান খোঁজা হবে সমকালীন সংকটের। স্বতন্ত্র ও নব ব্যঞ্জনায় উপস্থাপিত হবে তাঁর চারিত্রিক গুণাবলি। এ পর্যন্ত পৃথিবীতে তাঁকে নিয়েই সবচেয়ে বেশি জীবনীগ্রন্থ রচিত হয়েছে। জীবনীগ্রন্থ রচয়িতাদের তালিকায় রয়েছেন অনেক অমুসলিম। অখণ্ড বঙ্গে তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ভাই গিরিশচন্দ্র সেন, রামপ্রাণ গুপ্ত, কুমার মিত্র প্রমুখ। তাঁর জীবনের লৌকিক দিক তথা প্রাত্যহিক জীবনাচার তাঁকে যেমন মানবীয় গুণাবলিতে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছে, তেমনি অতীন্দ্রিয় কার্যকলাপে তিনি শ্রেষ্ঠ পয়গম্বরের আসনে অধিষ্ঠিত হয়ে আছেন। এ প্রসঙ্গে একজন সিরাতগ্রন্থ রচয়িতা কবি গোলাম মোস্তফা তাঁর ‘বিশ্বনবী’ গ্রন্থে বলেন, “হযরত মুহম্মদকে যাঁহারা কেবল মাত্র অতিমানুষরূপে মানবগণ্ডির ঊর্ধ্বে তুলিয়া ধরিবেন তাঁহারা যেমন ভুল করিবেন, যাঁহারা তাঁহাকে আমাদেরই মত মাটির মানুষ বলিয়া ধূলায় নামাইয়া আনিবেন, তাঁহারাও ঠিক তেমনই ভুল করিবেন। হযরত মুহম্মদ ছিলেন মানুষ ও অতিমানুষের মিলিতরূপ। স্রষ্টাও সৃষ্টির মধ্যে ছিলেন মাধ্যম বা বাহন। অন্য কথায় তিনি ছিলেন আল্লার রসুল বা খলিফা। এই ভঙ্গিতে দেখিলেই তাঁহাকে চেনা সহজ হয়।” (পৃষ্ঠা ৫)

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নবুওয়াতি জীবনের চেয়ে নবুওয়াত পূর্ববর্তী জীবনের পরিধি বেশি। ৪০ বছর, আর ২৩ বছর। উত্তম মানবের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতেই এ সময় সীমাটার প্রয়োজনছিল। দীর্ঘ ৪০ বছর জীবনে নানা ঘটনা, সংঘাত আর সংকটে তিনি নিজেকে একজন আদর্শ মানবরূপে প্রতীয়মান করেছেন। পিতৃহীন শিশু মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবনের প্রথম ৫টি বছর কেটেছে জন্মস্থান মক্কানগরী থেকে প্রায় ৯০ কিমি দূরে বেদুইনদের মরু উপত্যকায়। মরু অঞ্চলের সংগ্রামী জীবনে তিনি অভ্যস্ত হন, শিখেন সাদ গোত্রের চর্চিত বিশুদ্ধ আরবি ভাষা। ছয় বছর বয়সে মায়ের সান্নিধ্য পেলেও কাটেনি বেশি দিন। মায়ের মৃত্যুতে শিশু মোহাম্মদের ঠাঁই হয় তাঁর দাদা-দাদির কোলে। দাদা আব্দুল মুত্তালিব ও দাদি ফাতিমা আমর এতিমশিশু মোহাম্মদকে স্নেহ-মমতায় আগলে রাখেন। ৮ বছর বয়সে দাদার মৃত্যুতে বালক মোহাম্মদের পুরুষ অভিভাবক হন চাচা আবু তালিব। বিবাহ অবধি ১৭ বছর তিনি চাচার গৃহেই কাটিয়েছেন। ইতোমধ্যে মক্কার লোকজনের কাছ থেকে লাভ করেন সাদেক (সত্যবাদী), আল আমিন (বিশ্বাসী) ইত্যাদি উপাধি। সমকালীন সমাজ দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে বরং সমাজকে প্রভাবিত করেন। তাঁর অনন্য মানবীয় গুণের কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
তরুণ মোহাম্মদের সততা ও ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হন ‘তাহিরা (পবিত্র)’ উপাধিধারী এক ব্যবসায়ী নারী। তিনিই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রথম স্ত্রী ও প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী খাদিজা রাদিআল্লাহু আনহুমা। ইমলামের প্রথম শহিদও কিন্তু একজন মহিলা (হজরত সুমাইয়া রাদিআল্লাহু আনহু)। এসব দৃষ্টান্তে আমাদের জন্যে বার্তা রয়েছে। কেবল গভীর ভাবে উপলব্ধির অভাব।
নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ২১ বছর বয়সে সংঘটিত একটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গড়ে ওঠে বিশ্ব ইতিহাসের প্রথম সামাজিক সংগঠন ‘হিলফুল ফুজুল’ বা ‘শান্তিসংঘ।’ সকল অনাচার, অন্যায়, অবিচার, বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা দূর করতে সমাজের বয়োজ্যেষ্ঠ নেতাদের এ চুক্তিতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তারও অনেক পরে এরকমই একটা প্রেক্ষাপটে (মাৎস্যন্যায় থেকে বাঁচতে) অষ্টম শতকে বাংলায় সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা গঠন করেছিলেন ‘প্রকৃতিপুঞ্জ।’ ৩৫ বছর বয়সে রাসুলসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বিচারিক প্রজ্ঞার এক অভূতপূর্ব পরিচয় পাওয়া যায়। সংস্কার কাজের পর মর্যাদাপূর্ণ কালোপাথর (হাজরে আসওয়াদ) কাবাঘরের পূর্বকোণে প্রতিস্থাপন করা নিয়ে মক্কার গোত্রপতিদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের উপক্রম হয়। শেষ পর্যন্ত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বুদ্ধিমত্তায় সমস্যাটির ন্যায্য সমাধানে সকলেই খুশি হন। তিনি পাথরটিকে এক চাদরে রেখে চার গোত্রপ্রধানকে চাদরের চার কোণায় ধরে তা যথা স্থানে রাখার পরামর্শ দেন। নুর পর্বতের হেরা গুহায় তিনি ওহি বা প্রত্যাদেশ প্রাপ্ত হন। কিন্তু এর আগে সেখানে একাকি নিয়মিত গিয়ে কেন তিনি চিন্তা মগ্ন হতেন সেটা আজও ভাববার বিষয়। এর মূলে থাকতে পারে গভীর দার্শনিকতা, সমাজ ও জগতের প্রতি তাঁর গভীর দায়বোধ ও মানবিক মূল্যবোধ। যুগে যুগে সমাজ পরিবর্তনে যারা অগ্রগামী হতে চান, মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকলের জন্য নবি মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে পারেন এক অনুপম দৃষ্টান্ত।
হিজরত পরবর্তী মদিনায় পাওয়া যায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয়। প্লেটো, অ্যারিস্টটলের আদর্শ রাষ্ট্র চিন্তার প্রকাশ ঘটেছে বইয়ের পাতায়, আর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আদর্শ রাষ্ট্র চিন্তার প্রকাশ তাঁর মদিনা রাষ্ট্র নির্মাণে। যেখানে মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকলের নাগরিক অধিকার সমান ছিল। প্রত্যেকের নিজনিজ ধর্মপালনের ছিল পূর্ণ স্বাধীনতা । বর্তমানে ইসলামি রাষ্ট্র নিয়ে রয়েছে অনেকের ভ্রান্ত ধারণা। ইসলামি রাষ্ট্র মানেই ইসলামি শরিয়তের বিধান নাগরিকমাত্রই প্রযোজ্য নয়। হুদায়বিয়ার সন্ধি স্থাপনে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দূরদর্শিতা রক্তপাতহীন মক্কা বিজয়ের ভিত্তি তৈরি করেছিল। পৃথিবীর যে কোনো মনীষী, শিল্পী-সাহিত্যিকের কালজয়ী অভিভাষণ, ওজস্বী বক্তব্য তাঁর বিদায় হজের ভাষণের কাছে ম্লান হয়ে যাবে। এক গভীর আবেগময়ী, হৃদয় স্পর্শী ভাষায় দেওয়া রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ভাষণে নবধর্মে দীক্ষিত লাখো লাখো জনতা সেদিন ভাবাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন, মূহ্যমান হয়ে পড়েছিলেন অজানা এক বিয়োগব্যথায় । সে ভাষণ পড়লে আজও যে কেউ ভাবাবেশে ভেসে যাবে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এসব গুণ অসাধারণ হলেও অতিমানবীয় নয়। কুরআনুল কারিমে বলা হয়েছে, “রাসুলের জীবনে তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ।” (সুরা: আহযাব, আয়াত: ২১) এ আদর্শ মানবীয়, ভাববাদী আদর্শ নয়। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবনের প্রায়োগিক দিকগুলো সমগ্র বিশ্বমানবতার জন্য অনুসরণীয়, অনুকরণীয়।
মোঃ সাইফুল ইসলাম : প্রভাষক ও বিভাগীয় প্রধান, বাংলাবিভাগ, শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজ।





