মৌলভীবাজারে ২৩ বাঁশমহালের বাঁশ-বেত লুটের মহোৎসব
প্রকাশিত হয়েছে : ২৯ অক্টোবর ২০২৫, ৪:৪৬ অপরাহ্ণ

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, মৌলভীবাজার জেলার চারটি রেঞ্জে মোট ২৩টি বাঁশমহাল রয়েছে রাজকান্দি রেঞ্জে ৭টি, জুড়ী রেঞ্জে ৭টি, বড়লেখায় ৪টি এবং কুলাউড়া রেঞ্জে ৫টি। প্রায় ৪০ হাজার ৫৫ একর বনভূমি এই মহালগুলোর আওতায়।
সিলেট বন বিভাগ ২০২৫ সালের ২০ এপ্রিল ২০২৫ ২৬ অর্থবছরের জন্য বাঁশমহালের দরপত্র আহ্বান করেছিল, কিন্তু কোনো নিবন্ধিত মহালদারই অংশ নেননি। ফলে সরকারিভাবে মহাল শূন্য থাকলেও বাস্তবে সেখানে চলছে অবাধ লুট।
রাজকান্দি রেঞ্জের লেওয়াছড়া, বাঘাছড়া, কুরমাছড়া, সোনারাইছড়া ও ডালুয়াছড়া মহালে ঘুরে দেখা গেছে সব মহালেই বনের বাঁশ কেটে ফেলার প্রমাণ। কোথাও পড়ে আছে গোড়া, কোথাও বাঁশের ফাঁকা টিলা, আবার কোথাও আগুনে পুড়ে যাওয়া কালো ধোঁয়া।
চোরকারবারিরা কেবল বাঁশ চুরি করেই থেমে থাকছে না। চুরির আলামত মুছে ফেলতে তারা অনেক সময় আগুন লাগিয়ে দেয় বনের ভেতরে। এতে যেমন অপরাধের প্রমাণ ধ্বংস হয়, তেমনি পুড়ে ছাই হয়ে যায় বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য।

২০২৩ সালের মার্চ সানে মৌলভীবাজারের জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলার পাথারিয়া হিলস রিজার্ভ ফরেস্টের সমনবাগ বিটে দেখা গেছে ভয়াবহ দৃশ্য। কোটি টাকার বাঁশ উজাড় করে ফেলার পর আগুন লাগানো হয় পুরো বনে। এখানকার ধলছড়ি, মাকাল জোরা ও আলামবাড়ি এলাকার প্রায় ৪০ হেক্টর বনভূমি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। বন বিভাগের তথ্যমতে “মাত্র দুই হেক্টর ক্ষতি” হলেও সরেজমিনে দেখা গেছে অন্তত ১২টি টিলা আগুনে পুড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বন বিভাগের কর্মকর্তাদের মদদেই বনের বাঁশ কেটে চুরি করা হয়, তারপর আগুন দিয়ে প্রমাণ ধ্বংস করা হয়। এক সময় বন্য হাতির আশ্রয়স্থল এই বন এখন পরিণত হয়েছে কালো বিরানভূমিতে। স্থানীয়রা বলছেন, এটি পরিকল্পিতভাবে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার কৌশল, যাতে চুরির আলামত মুছে ফেলা যায়। খাসিয়া শ্রমিক ও চা-বাগানের দিনমজুরদের কাজে লাগিয়ে সপ্তাহজুড়ে বাঁশ কাটার পর সেটি ছড়ার পানিতে ভাসিয়ে পাচার করা হয়। পরদিনই সেখানে আগুন জ্বলে ওঠে। আগুনে পুড়ে মারা যায় অগণিত বন্যপ্রাণী যাদের মধ্যে আছে চারটি বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির হাতি, মায়াহরিণ ও অসংখ্য পাখি।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) মৌলভীবাজার জেলা সভাপতি সালেহ সোহেল বলেন, চুরি করে বাঁশ বিক্রি করাই এখন লাভজনক ব্যবসা। আইন প্রয়োগ না থাকায় কেউ বাঁশমহাল ইজারা নিতে চায় না। এভাবে চললে কয়েক বছরের মধ্যে বনে বাঁশ বা বেতের অস্তিত্বই থাকবে না। ইজারা প্রথা বাঁশবনের সবচেয়ে বড় ক্ষতি করেছে। বাঁশকে বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত করে প্রকৃতির পুনর্জন্ম প্রক্রিয়া নষ্ট করা হয়েছে। এখন সময় এসেছে ইজারা প্রথা বন্ধ করে বাঁশকে প্রাকৃতিক বনায়নের আওতায় আনা। এতে শুধু বনই বাঁচবে না, টেকসই ভাবে বাঁশও সংরক্ষিত থাকবে।
তিনি বলেন, বাঁশকে রাজস্ব নয়, বনায়নের সম্পদ হিসেবে দেখতে হবে। ইজারা প্রথা বন ধ্বংসের প্রধান কারণ। এখনই এই পদ্ধতি বন্ধ করে টেকসই বাঁশ ব্যবস্থাপনা চালু করা জরুরি।
মৌলভীবাজার পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি সৈয়দ মহসীন পারভেজ বলেন, বাঁশমহাল শুধু রাজস্বের উৎস নয়, এটি আমাদের পাহাড়ি জীববৈচিত্র্যের অংশ। কিন্তু এখন প্রশাসনের দুর্বলতা আর বন বিভাগের উদাসীনতায় বাঁশবনগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। সাংবাদিকরা বারবার প্রতিবেদন করলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। সময় থাকতে কঠোর নজরদারি না আনলে এই বাঁশবন কাগজে কলমেই টিকে থাকবে।
তিনি বলেন, বাঁশ প্রাকৃতিকভাবে বন পুনর্জন্মে সহায়ক এক উদ্ভিদ। এই সম্পদ রক্ষা করা মানে বন রক্ষা করা। বাঁশমহাল ইজারা ও ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা না আনলে পুরো অঞ্চলের পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। স্থানীয় সাংবাদিকদের অনুসন্ধানগুলো নীতিনির্ধারণে কাজে লাগাতে হবে।
সিলেট বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক মোহাম্মদ নাজমুল আলম বলেন, বাঁশমহালগুলোর ইজারা না হওয়ার পেছনে কিছু প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতা রয়েছে। এখন প্রতিটি মহালের বাঁশের পরিমাণ ও পুনর্জন্মক্ষমতা নির্ণয়ের জন্য একটি টিম মাঠে কাজ করছে। রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর টেকসইভাবে যেসব মহাল ইজারা দেওয়া সম্ভব হবে, সেখানে দরপত্র আহ্বান করা হবে। অবৈধভাবে বাঁশ কাটা বা পাচারের বিষয়ে আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি।






