শ্রীমঙ্গলে দেশের আগাম দুর্গাপূজা শুরু, নয় রূপে দেবীর আরাধনা
প্রকাশিত হয়েছে : 12 October 2026, 1:05 am

ছবি: পূর্বদিক
নিজস্ব প্রতিবেদক: শারদীয় দুর্গোৎসবের আগেই মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে শুরু হয়েছে নয় দিনব্যাপী দেশের আগাম দুর্গা পূজা। উপজেলার ইছামতী চা-বাগানের শ্রীশ্রী মঙ্গলচণ্ডী মন্দিরে রোববার সকালে নবদুর্গার প্রথম রূপ শৈলপুত্রীর পূজার মধ্য দিয়ে শুরু হয় এ আয়োজন। প্রতিদিন দেবীর একেকটি রূপের পূজা ও আরাধনা করবেন ভক্তরা। পূজা দেখতে প্রথম দিন থেকেই মন্দিরে সমবেত হচ্ছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।
শাস্ত্রীয় বিধান অনুসারে, দেবী দুর্গার নয়টি রূপ যথাক্রমে শৈলপুত্রী, ব্রহ্মচারিণী, চন্দ্রঘণ্টা, কুষ্মাণ্ডা, স্কন্দমাতা, কাত্যায়নী, কালরাত্রি, মহাগৌরী ও সিদ্ধিদাত্রীর পূজা করা হয়। দেবীর এই নয়টি রূপের আরাধনাই নবদুর্গা পূজা হিসেবে পরিচিত।
সোমবার সকালে মঙ্গলচণ্ডী মন্দিরে গিয়ে দেখা যায়, মণ্ডপে সারিবদ্ধভাবে স্থাপন করা হয়েছে দেবী দুর্গার নয়টি রূপের নয়টি প্রতিমা। মন্ত্রোচ্চারণ, পূজা-অর্চনা ও ঢাকের বাদ্যে মুখর হয়ে উঠেছে মন্দির প্রাঙ্গণ। ভক্তরা দেবীর চরণে পুষ্পাঞ্জলি নিবেদন করে নিজেদের, পরিবারের ও দেশের মঙ্গল কামনা করছেন।
পৌরাণিক আচার অনুসারে, পূজার দ্বিতীয় দিনে সোমবার দেবীর ব্রহ্মচারিণী রূপের আরাধনা করা হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে চন্দ্রঘণ্টা, কুষ্মাণ্ডা, স্কন্দমাতা, কাত্যায়নী, কালরাত্রি, মহাগৌরী ও সিদ্ধিদাত্রী রূপের পূজা অনুষ্ঠিত হবে।
পরিবার নিয়ে পূজা দেখতে আসা শ্রাবণী তালুকদার বলেন, “আগামী ১৬ অক্টোবর থেকে শুরু হচ্ছে শারদীয় দুর্গাপূজা। তবে মঙ্গলচণ্ডী মন্দিরের নবদুর্গা পূজা ব্যতিক্রমধর্মী। এখানে দেবীর নয়টি রূপের পূজা করা হয়। অনেক বছর ধরে এ পূজা হয়ে আসছে। এবারই প্রথম পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এখানে এসেছি। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসব। মায়ের কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন পৃথিবীর সবার মঙ্গল করেন। সবাই যেন সুখে-শান্তিতে থাকে।”
ঋষিকা সাহা দেবী বলেন, “মহালয়া ছিল গতকাল। আজ থেকে শুরু হয়েছে নবদুর্গা পূজা। এর আগে নবদুর্গা পূজার কথা শুনেছি, কিন্তু কখনো সরাসরি দেখা হয়নি। এবারই প্রথম ঢাকা থেকে এখানে এসেছি এবং প্রথমবারের মতো নবদুর্গা পূজা দেখছি। বিষয়টি আমার কাছে খুবই ভালো লাগছে। আমি চাই, আজকের মতো আগামী দিনগুলোতেও যেন শান্তিপূর্ণভাবে পূজা উদ্যাপন করতে পারি। দেশ ও জাতির মঙ্গল কামনা করি। মা দুর্গার কাছে প্রার্থনা করি, আমরা যেন সবাই সুস্থ ও ভালো থাকি। আমাদের দেশ ও জাতি যেন সাম্প্রদায়িকতামুক্ত হয়ে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় জেগে ওঠে।”
অর্না দেবনাথ বলেন, “এখানে প্রতিবছরই নবদুর্গা পূজা হয়। আমরাও প্রতিবছর পূজা দেখতে আসি। সাধারণত দুর্গাপূজা ষষ্ঠী থেকে শুরু হলেও এখানে মহালয়ার পরদিন থেকেই পূজা শুরু হয়। তাই এই পূজা আমাদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের। আমরা পরিবারের সবাই মিলে এখানে আসি, ঘুরে বেড়াই এবং মায়ের কাছে বিভিন্ন মনোবাসনা নিয়ে প্রার্থনা করি। আশা করি, মা আমাদের মনের আশা পূরণ করবেন। মায়ের কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের পরিবারের সবাইকে ভালো রাখেন, সবার মঙ্গল করেন এবং আমাদের জীবনে সুখ ও শান্তি বয়ে আনেন।”
পুরোহিত দীপংকর ভট্টাচার্য্য বলেন, “নবদুর্গা পূজায় দেবী দুর্গার নয়টি রূপের আরাধনা করা হয়। সাধারণত দুর্গাপূজায় ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত দেবীর একই রূপের পূজা করা হয়। কিন্তু নবদুর্গা পূজায় প্রতিপদ থেকে নবমী পর্যন্ত দেবীর নয়টি ভিন্ন রূপের পূজা করা হয়। দেবী দুর্গা বিভিন্ন রূপে আবির্ভূত হয়ে জগতের কল্যাণ সাধন করেন। তাঁর এই নয়টি রূপের আরাধনার মধ্য দিয়ে আমরা জগতের মঙ্গল কামনা করি।”
শ্রীশ্রী মঙ্গলচণ্ডী সেবাশ্রম নবরূপে নবদুর্গা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সহসভাপতি স্বাধীন চাষা বলেন, “শ্রীশ্রী মঙ্গলচণ্ডী মন্দির আমাদের ঐতিহ্যবাহী ও প্রাচীন একটি মন্দির। এটি অত্যন্ত জাগ্রত একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। এবার আমাদের নবদুর্গা পূজার ১৬তম আয়োজন। ২০১০ সাল থেকে এখানে নিয়মিত এ পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দেশের অন্যান্য স্থানে যখন দুর্গাপূজার প্রস্তুতি চলে, তখন আমাদের মন্দিরে নবদুর্গা পূজা শুরু হয়। নবদুর্গা পূজা উপলক্ষে সব সনাতন ধর্মাবলম্বী ভক্তকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি, তাঁরা যেন মায়ের চরণে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করতে এবং আমাদের সেবাশ্রমে এসে পূজায় অংশ নিতে পারেন। আমাদের সভাপতি পরিমল ভূমিকার উদ্যোগ ও সহযোগিতায় গত ১৬ বছর ধরে এখানে নবদুর্গা পূজার অর্চনা হয়ে আসছে। আমরা ভবিষ্যতেও এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে চাই।”
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শ্রীমঙ্গলের অন্যতম প্রাচীন স্থাপনা হিসেবে পরিচিত শ্রীশ্রী মঙ্গলচণ্ডী মন্দির। শ্রীমঙ্গল নামের উৎপত্তির সঙ্গে মঙ্গলচণ্ডী মন্দিরের সম্পর্ক রয়েছে বলেও স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত ধারণা রয়েছে। ঐতিহাসিক এ স্থাপনার ঐতিহ্য ধরে রাখা এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর নবদুর্গা পূজার আয়োজন করা হয়।
শাস্ত্রীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, নবদুর্গার নয়টি রূপের আরাধনায় ভক্তরা শক্তি, সাহস ও সাফল্য লাভের প্রার্থনা করেন।
শারদীয় দুর্গোৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরুর আগেই এ পূজা অনুষ্ঠিত হয় বলে এটি স্থানীয়ভাবে ‘আগাম দুর্গাপূজা’ বা ‘নবদুর্গা পূজা’ নামে পরিচিত।
আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগামী ২১ অক্টোবর দশমী পূজা ও প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে এবারের নবদুর্গা পূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হবে।
পূর্বদিক/এসএ





