যে কারণে দুই দিন সপ্তমী, আজও সপ্তমী তিথিতে পূজিত হচ্ছেন মা দুর্গা
প্রকাশিত হয়েছে : 18 October 2026, 9:13 am

ছবি: পূর্বদিক
নিজস্ব প্রতিবেদক: শারদীয় দুর্গাপূজায় মহাসপ্তমীর তিথি দুই দিন হওয়ায় বিভ্রান্তিতে পড়েছেন অনেক ভক্ত। পঞ্জিকার হিসাব অনুযায়ী, এবার সপ্তমী তিথি বিস্তৃত হয়েছে দুই ক্যালেন্ডার দিনে। তিথির সময়কাল ও সূর্যোদয়ের হিসাবের কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তবে এ নিয়ে পূজার আচার-অনুষ্ঠানে বিশেষ কোনো সমস্যা হবে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
হিন্দু পঞ্জিকায় তিথি নির্ধারিত হয় চন্দ্র ও সূর্যের কৌণিক দূরত্বের ভিত্তিতে। ফলে একটি তিথি কখনো কখনো দুই ক্যালেন্ডার দিনে বিস্তৃত হতে পারে। সূর্যোদয়ের সময় কোন তিথি কার্যকর রয়েছে, তা পূজার দিন নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ কারণে কোনো কোনো বছর একই তিথি দুই দিনের সূর্যোদয়ে পাওয়া যায়।
মহানগর সার্বজনীন পূজা উদযাপন কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সপ্তমীর পূজায় ব্রহ্মমুহূর্তের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ে পূজার আচার সম্পন্ন করার বিষয়টিও তিথি গণনার সঙ্গে সম্পর্কিত।
এ বিষয়ে পুরোহিত দেবদাস গোস্বামী জানান, তিথির সময়ের সংযোগ ও গণনার কারণে কোনো কোনো বছর একই তিথি দুই দিনে বিস্তৃত হতে পারে। ফলে পঞ্জিকায় সপ্তমী দুই দিন দেখা যায়।
ষষ্ঠীতে শুরু দুর্গোৎসব, সপ্তমীতে চক্ষুদান
চণ্ডীপাঠ, ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি ও উলুধ্বনির মধ্য দিয়ে মহাষষ্ঠীতে দেবী দুর্গাকে বরণ করে নেওয়ার মাধ্যমে শুরু হয়েছে শারদীয় দুর্গোৎসব। ষষ্ঠীপূজায় বিল্ববৃক্ষের নিচে কল্পারম্ভ, বোধন ও ষষ্ঠীবিহিত পূজার মাধ্যমে দেবীকে জাগ্রত ও আবাহনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। এরপর খুলে দেওয়া হয় মণ্ডপ, শুরু হয় ভক্তদের দেবীদর্শন।
মহাসপ্তমীতে ষোড়শোপচারে দেবী দুর্গার পূজা করা হয়। এদিন সকালে নবপত্রিকা স্নান ও স্থাপনের পাশাপাশি দেবীর চক্ষুদান, আসন, বস্ত্র, নৈবেদ্য, পুষ্পমাল্য, চন্দন, ধূপ ও দীপ দিয়ে পূজার আয়োজন করা হয়। ভক্তরা মণ্ডপে এসে দেবীর সামনে অঞ্জলি দেন এবং তাঁর আশীর্বাদ কামনা করেন।
অষ্টমীতে কুমারীপূজা, বিশেষ আকর্ষণ সন্ধিপূজা
দুর্গোৎসবের অন্যতম আকর্ষণ মহাষ্টমী। এদিন কল্পারম্ভ ও বিহিত পূজার পাশাপাশি বিভিন্ন মণ্ডপে কুমারীপূজার আয়োজন করা হয়। ঢাকার রামকৃষ্ণ মিশন মন্দিরে সকাল সাড়ে ৯টায় কুমারীপূজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, কুমারী বালিকার মধ্যে দেবীশক্তির প্রতীকী রূপ কল্পনা করে তাঁকে দেবীজ্ঞানে পূজা করা হয়। শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণের শিক্ষা অনুযায়ী, শুদ্ধাত্মা কুমারীর মধ্যে ভগবতীর রূপ বিশেষভাবে প্রকাশিত হয়। মাতৃরূপ উপলব্ধি করাই এ পূজার অন্যতম উদ্দেশ্য।
শাস্ত্রীয় বিধান অনুসারে, সাধারণত এক থেকে ১৬ বছর বয়সী অবিবাহিত কন্যাকে কুমারীরূপে পূজা করা হয়। বয়সভেদে তাঁদের বিভিন্ন নামে অভিহিত করার প্রথাও রয়েছে। পূজার আগে নির্বাচিত কুমারীকে স্নান করিয়ে নতুন পোশাকে সাজানো হয়। কপালে সিঁদুর, পায়ে আলতা ও হাতে ফুল দিয়ে সুসজ্জিত আসনে বসিয়ে ষোড়শোপচারে পূজা করা হয়। এ সময় শঙ্খধ্বনি, ঢাকের বোল, উলুধ্বনি ও দেবীস্তোত্রে মুখর হয়ে ওঠে মণ্ডপ।
অষ্টমী ও নবমী তিথির সন্ধিক্ষণে অনুষ্ঠিত হয় সন্ধিপূজা। অষ্টমীর শেষ ২৪ মিনিট এবং নবমীর প্রথম ২৪ মিনিট, অর্থাৎ মোট ৪৮ মিনিট ধরে এ পূজা সম্পন্ন করা হয়। এ সময় দেবী চামুণ্ডার আরাধনা করা হয়। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এ সন্ধিক্ষণেই দেবী দুর্গা চণ্ড ও মুণ্ডকে বধ করেছিলেন।
নবমীতে বিদায়ের সুর, দশমীতে বিসর্জন
মহানবমীতে দেবীর পূজার পাশাপাশি ভক্তদের মনে ধীরে ধীরে বিদায়ের বিষাদ নেমে আসে। সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, নবমী তিথিতে অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠার মাহাত্ম্য স্মরণ করা হয়। নবমীর রাতের মধ্য দিয়ে উৎসবের আনন্দে বিদায়ের আবহ যুক্ত হয়। পরদিন বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে শেষ হয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা।
এবার বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানাবেন ভক্তরা। মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির নেতৃত্বে রাজধানীর পলাশীর মোড় থেকে বিজয়া শোভাযাত্রা বের হয়ে সদরঘাটের ওয়াইজঘাটে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়ার কথা রয়েছে।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীসহ সারা দেশে বিজয়া দশমী উপলক্ষে শোভাযাত্রা ও প্রতিমা বিসর্জনের আয়োজন করা হবে। এবারের দুর্গোৎসবে দেবীর গমন নৌকায় বলে প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাস ও পঞ্জিকায় উল্লেখ রয়েছে।
দুর্গাপূজায় ছুটি পাঁচ দিন
হিন্দু সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার নির্বাহী আদেশে দুর্গাপূজার ছুটি বাড়িয়েছে। সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে বর্ধিত ছুটি যুক্ত হওয়ায় ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত মোট পাঁচ দিনের ছুটি পাওয়ার কথা রয়েছে। ফলে পূজার আনন্দ উপভোগের পাশাপাশি পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পাবেন অনেকেই।
ঢাকা মহানগরে কমেছে মণ্ডপ, দেশজুড়ে বেড়েছে
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এবার ঢাকা মহানগরে ২৫৮টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ২৬১। সে হিসাবে এবার মহানগরে তিনটি মণ্ডপ কমেছে।
অন্যদিকে, সারা দেশে এবার ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৩২ হাজার ৩৫১। অর্থাৎ, গত বছরের তুলনায় এবার সারা দেশে পূজার আয়োজন বেড়েছে ১ হাজার ৫০০টি। এ হিসাবের মধ্যে প্রতিমা পূজার পাশাপাশি ঘটে আয়োজিত পূজাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি, আরতি ও ভক্তদের প্রার্থনায় মুখর হয়ে উঠেছে পূজামণ্ডপগুলো। মহাসপ্তমী থেকে মহানবমী পর্যন্ত পূজা-অর্চনা ও নানা ধর্মীয় আয়োজনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাবে শারদীয় দুর্গোৎসব। বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে পাঁচ দিনের এ প্রধান ধর্মীয় উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা।





