রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি লোডিং শুরু: বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে ঐতিহাসিক অগ্রগতি
প্রকাশিত হয়েছে : ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ৩:৩০ অপরাহ্ণ

ছবি: সংগৃহীত
পূর্বদিক ডেস্ক: এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অবকাঠামো নির্মাণ ও কারিগরি প্রস্তুতির পর অবশেষে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে বাংলাদেশ। পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মা নদীর তীরে নির্মিত দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুরের প্রথম ইউনিটে আজ শুরু হচ্ছে জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম।
গত ১৬ এপ্রিল পারমাণবিক চুল্লিতে জ্বালানি প্রবেশের কমিশনিং লাইসেন্স পাওয়ার পর সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে আজ বিকেলে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হচ্ছে এই ঐতিহাসিক কার্যক্রম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি লোডিং শুরু হওয়া মানেই সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়। পারমাণবিক জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত ইউরেনিয়াম রিঅ্যাক্টরের কোরে স্থাপন করার মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়ার সূচনা হয়।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সাধারণত স্বল্পমাত্রায় পরিশোধিত ইউরেনিয়াম ব্যবহার করা হয়। এই পর্যায়টি মূলত নির্মাণ পর্যায় থেকে উৎপাদন পর্যায়ে উত্তরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. শৌকত আকবর বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি লোডিং একটি বড় মাইলফলক। এটি বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রথম ধাপ, যা প্রকল্পটিকে কার্যক্রম শুরুর পর্যায়ে নিয়ে যায়।
তিনি আরও বলেন, জ্বালানি লোডিংয়ের পর রিঅ্যাক্টরের ভেতরে নিয়ন্ত্রিত চেইন রিঅ্যাকশন বা ‘ফিশন বিক্রিয়া’ শুরু হয়, যাকে বলা হয় ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’। শুরুতে রিঅ্যাক্টরকে খুবই কম ক্ষমতায় (প্রায় ১ থেকে ৩ শতাংশ) চালিয়ে বিভিন্ন কারিগরি প্যারামিটার পর্যবেক্ষণ করা হয়।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কেন্দ্রীয় অংশ হলো রিঅ্যাক্টর। এখানেই ইউরেনিয়াম জ্বালানি স্থাপন করা হয়। রূপপুর প্রকল্পটি ভিভিআর-১২০০ প্রযুক্তির রিঅ্যাক্টরের মাধ্যমে পরিচালিত হবে।
এই প্রক্রিয়ায় ইউরেনিয়ামের নিউক্লিয়াস বিভাজনের মাধ্যমে প্রচুর তাপশক্তি উৎপন্ন হয়। সেই তাপ ব্যবহার করে পানি উচ্চচাপে বাষ্পে রূপান্তরিত করা হয়, যা টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। পুরো প্রক্রিয়াটি একটি নিয়ন্ত্রিত চেইন রিঅ্যাকশনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
রিঅ্যাক্টর কোরে মোট ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি স্থাপন করতে প্রায় ৩০ দিন সময় লাগবে। পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নির্দেশিকা মেনে সম্পন্ন করা হবে।
জ্বালানি লোডিং শেষে শুরু হবে ফিজিক্যাল স্টার্টআপ পর্যায়। এ সময়ে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে রিঅ্যাক্টরের কার্যকারিতা যাচাই করা হবে, যা প্রায় ৩৪ দিন স্থায়ী হতে পারে।
এরপর ধাপে ধাপে রিঅ্যাক্টরের সক্ষমতা বাড়ানো হবে—প্রথমে ৩%, তারপর ৫%, ১০%, ২০% এবং শেষে ৩০% পর্যন্ত উন্নীত করা হবে। এই ধাপে পৌঁছাতে প্রায় ৪০ দিন সময় লাগতে পারে।
রিঅ্যাক্টর ৩০ শতাংশ ক্ষমতায় পৌঁছালে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে। এরপর ধীরে ধীরে উৎপাদন বাড়িয়ে পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছাতে আরও প্রায় ১০ মাস সময় লাগবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। প্রতিটি ধাপে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী কঠোর পর্যবেক্ষণ চালানো হচ্ছে।
পারমাণবিক শক্তি নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিতর্ক থাকলেও আধুনিক বাস্তবতায় এটি পরিচ্ছন্ন জ্বালানি হিসেবে বিবেচিত। এতে কার্বন নিঃসরণ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কয়লা-নির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় বছরে প্রায় ২০ মিলিয়ন টন এবং গ্যাস-নির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় প্রায় ৮ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন হ্রাসে ভূমিকা রাখবে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন নির্মাণ পর্যায় পেরিয়ে কার্যক্রম শুরুর এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপে প্রবেশ করেছে। এটি বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে এক নতুন যুগের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পূর্বদিক/এসএ





