ইউরোপের এআই স্টার্টআপে রেকর্ড ২৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ, শীর্ষে যুক্তরাজ্য
প্রকাশিত হয়েছে : ৮ আগস্ট ২০২৬, ৪:৫৩ অপরাহ্ণ

Screenshot
ওমর ফারুক নাঈম::
ইউরোপে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের স্টার্টআপগুলোতে ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে (এইচ ওয়ান) রেকর্ড ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ হয়েছে। এক বছর আগের একই সময়ের তুলনায় এ বিনিয়োগ বেড়েছে ১৩০ শতাংশ। একই সঙ্গে ইউরোপে হওয়া মোট ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বিনিয়োগের ৫৫ শতাংশই গেছে এআইভিত্তিক স্টার্টআপগুলোর হাতে।
বুধবার প্রকাশিত ২০২৬ ইউরোপিয়ান এআই ইকোনমি রিপোর্টে এ তথ্য তুলে ধরেছে হিউম্যানএক্স এবং ক্রাঞ্চবেস।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে ইউরোপীয় এআই স্টার্টআপগুলো ১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ পেলেও ২০২৬ সালের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩ বিলিয়ন ডলারে। বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবৃদ্ধি শুধু বিনিয়োগ বৃদ্ধির ইঙ্গিত নয়; বরং বিশ্বব্যাপী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতিযোগিতায় ইউরোপের অবস্থান আরও শক্তিশালী হওয়ারও প্রমাণ।
হিউম্যানএক্স এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্টেফান ওয়েইৎজ বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিশ্ব প্রতিযোগিতায় ইউরোপ এখন আর পিছিয়ে নেই। বরং রোবটিক্স, স্বাস্থ্যসেবা, উন্নত উৎপাদন শিল্প ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির মতো যেসব ক্ষেত্রে ইউরোপ ঐতিহ্যগতভাবে শক্তিশালী, সেখানে বড় পরিসরে বিনিয়োগ হচ্ছে।
রিপোর্টে দেখা যায়, মোট বিনিয়োগের ৭৩ শতাংশ গেছে মাত্র ৩৮টি স্টার্টআপের কাছে, যাদের প্রত্যেকটি অন্তত ১০০ মিলিয়ন ডলার বা তার বেশি অর্থ সংগ্রহ করেছে।
২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই ছয়টি ইউরোপীয় এআই স্টার্টআপ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যায়নের পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর মধ্যে রয়েছে স্বয়ংচালিত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ওয়েভি, এলফ্যাবেট -এর মালিকানাধীন ওষুধ গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইসোমরফিক ল্যাবস, রোবটিক্স কোম্পানি নিউরা রোবোটিক্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণা প্রতিষ্ঠান এডভান্সড মেশিন ইন্টেলিজেন্স, যার সহ-প্রতিষ্ঠাতাদের একজন বিশ্বখ্যাত এআই গবেষক ইয়ান লেকুন।
এআই বিনিয়োগ আকর্ষণে ইউরোপের শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাজ্য। দেশটি একাই ১২ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ ইউরোপের মোট এআই বিনিয়োগের ৫৩ শতাংশ আকর্ষণ করেছে। এরপর রয়েছে জার্মানি, যেখানে বিনিয়োগ হয়েছে ৩.৫ বিলিয়ন ডলার (১৫ শতাংশ) এবং ফ্রান্স, যেখানে বিনিয়োগ হয়েছে ২.৯ বিলিয়ন ডলার (১২ শতাংশ)।
এদিকে, নেদারল্যান্ডসও দ্রুত এআই উদ্ভাবনের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে উঠে আসছে। নেদারল্যান্ডস ও যুক্তরাজ্যভিত্তিক কাস্পএআই ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের সিরিজ-বি বিনিয়োগ সংগ্রহ করেছে। অন্যদিকে, নেদারল্যান্ডসভিত্তিক জেনারাল ইনটুইশন সিরিজ-এ পর্যায়ে ৩২০ মিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছে।
তবে রিপোর্টে কিছু হতাশার বিষয় ফুটে উঠেছে। নারী উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে বৈষম্যের চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৩ সাল থেকে অন্তত একজন নারী প্রতিষ্ঠাতা থাকা এআই স্টার্টআপগুলো মোট বিনিয়োগ চুক্তির ১৮ শতাংশ সম্পন্ন করলেও তারা মোট অর্থায়নের মাত্র ১০ শতাংশ পেয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বড় অঙ্কের বিনিয়োগ এখনও মূলত পুরুষ নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছেই কেন্দ্রীভূত হওয়ায় এই বৈষম্য তৈরি হয়েছে।
ক্রাঞ্চবেস তাদের এআই-ভিত্তিক পূর্বাভাসে বলছে, ইউরোপের এআই খাতে বিনিয়োগের গতি আগামী দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকবে। হিউম্যান এক্স আমস্টারডাম-এ অংশ নেওয়া বেসরকারি এআই স্টার্টআপগুলোর মধ্যে, ৪৮ শতাংশের আবারও নতুন বিনিয়োগ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ১১ শতাংশ অন্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অধিগ্রহণ হতে পারে। ৭ শতাংশ শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির (আইপিও) পথে এগোচ্ছে।
এছাড়া ২০২২ সালের পর থেকে অন্তত ১০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ পাওয়া এক হাজারের বেশি ইউরোপীয় এআই স্টার্টআপ বিশ্লেষণ করে ক্রাঞ্চবেস পূর্বাভাস দিয়েছে, আগামী ১২ মাসে ৫৯ শতাংশ নতুন বিনিয়োগ সংগ্রহ করবে। ১৮ শতাংশ অধিগ্রহণের লক্ষ্য হতে পারে এবং ৫ শতাংশ শেয়ারবাজারে প্রবেশের সম্ভাবনা রয়েছে।
ক্রাঞ্চবেস এর সিনিয়র রিসার্চ লিড জেনে টিয়ার বলেন, বিজ্ঞান, শিল্প ও প্রকৌশলে ইউরোপের দীর্ঘদিনের শক্তির সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমন্বয়ই এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা। তবে দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে হলে মূলধন, কম্পিউটিং অবকাঠামো, দক্ষ জনবল এবং বাজার, এই চারটি ক্ষেত্রকে আরও কার্যকরভাবে সংযুক্ত করতে হবে।
এআই বিশ্লেষকদের মতে, রেকর্ড বিনিয়োগের এই ধারা প্রমাণ করছে যে ইউরোপ এখন শুধু এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রেই নয়, বরং উদ্ভাবন, গবেষণা এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও দ্রুত একটি শক্তিশালী কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। যদিও বড় বিনিয়োগ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কেন্দ্রীভূত হওয়া এবং নারী উদ্যোক্তাদের অর্থায়নে বৈষম্যের মতো চ্যালেঞ্জ এখনও রয়ে গেছে, তবুও সামগ্রিকভাবে ইউরোপের এআই অর্থনীতি নতুন এক যুগে প্রবেশ করছে।





