পঞ্চগড়ে আগাম আমন ধান কাটায় কৃষকের মুখে হাসি
প্রকাশিত হয়েছে : 3 November 2026, 11:29 pm

ছবি: পূর্বদিক
পঞ্চগড় প্রতিনিধি: ‘অগ্রহায়নের আট, যেখানে মন সেখানে ধান কাট’—উত্তরাঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে প্রচলিত এই প্রবাদ এখন অনেকটাই বদলে গেছে। আগাম জাতের আমন ধান চাষের ফলে অগ্রহায়নের অপেক্ষা না করেই কার্তিকের শুরুতে ধান কাটতে শুরু করেছেন পঞ্চগড়ের কৃষকরা। আগেভাগে নতুন ধান ঘরে তোলার আনন্দের পাশাপাশি বেড়েছে কৃষিশ্রমিকদের কর্মব্যস্ততা। ধান কাটার পর জমিতে শীতকালীন ফসল আবাদের প্রস্তুতিও নিচ্ছেন কৃষকরা।
একসময় আমন ধান রোপণের পর অগ্রহায়ন মাস পর্যন্ত কৃষিশ্রমিকদের হাতে তেমন কাজ থাকত না। আশ্বিন-কার্তিক মাসকে উত্তরাঞ্চলের অনেক এলাকায় অভাবের মাস হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কাজের সন্ধানে এ সময় অনেক শ্রমিককে অন্য জেলায় পাড়ি জমাতে হতো। তবে আগাম জাতের ধান চাষ এবং ধান কাটার পর একই জমিতে শীতকালীন ফসল আবাদের সুযোগ তৈরি হওয়ায় বদলে গেছে সেই চিত্র। এখন কৃষিশ্রমিকদের সারা বছরই কমবেশি কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
পঞ্চগড়ের অপেক্ষাকৃত উঁচু জমিতে ইতোমধ্যে আগাম জাতের আমন ধান পাকতে শুরু করেছে। কোথাও কোথাও চলছে ধান কাটা ও মাড়াই। ধান কাটার পর কাঁচা খড়ের চাহিদাও বেড়েছে। গোখাদ্যের সংকট থাকায় কৃষকরা কাঁচা খড় বিক্রি করে বাড়তি আয় করছেন।
কৃষকরা জানান, আগে অগ্রহায়ন মাসের শুরুতে আমন ধান কাটা শুরু হলেও আগাম জাতের ধান চাষের ফলে এখন এক থেকে দেড় মাস আগেই ফসল ঘরে তোলা সম্ভব হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমের শেষ দিকে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হওয়ায় এবার ভালো ফলনের প্রত্যাশা করছেন তাঁরা।
কৃষি বিভাগ ও কৃষকদের তথ্যমতে, আগাম জাতের ব্রি ধান-৩৩, ৫৬, ৬২ ও ৭২ এবং বিনা-৭-এর পাশাপাশি ভারতীয় জাতের গুটি স্বর্ণা ও স্বর্ণা পারি ধান পাকতে শুরু করেছে। পুরোনো জাতের আমন ধানে যেখানে প্রতি বিঘায় ৮ থেকে ১০ মণ ফলন পাওয়া যেত, সেখানে আগাম জাতের ধানে ১৫ থেকে ২০ মণ পর্যন্ত ফলন হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।
শুরুতে নতুন ধানের দাম কিছুটা কম থাকলেও কাঁচা খড় বিক্রি করে বাড়তি আয় করছেন তাঁরা। এক বিঘা জমির ধান কেটে মাড়াইয়ের পর অবশিষ্ট কাঁচা খড়ের আঁটি বাজারে আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ধান কাটার পর দ্রুত জমি চাষ দিয়ে আগাম আলু, সরিষা ও শীতকালীন শাকসবজি আবাদের প্রস্তুতি নিচ্ছেন কৃষকরা।
বিঘাপ্রতি ১৯-২০ মণ ফলনের আশা
পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার ময়দানদিঘী ইউনিয়নের প্রধানপাড়া গ্রামের কৃষক আব্দুল লতিফ এবার দুই বিঘা জমিতে আমন ধান চাষ করেছেন। তাঁর জমির সব ধান ইতোমধ্যে পেকে গেছে। আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যে ধান কাটার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি।
আব্দুল লতিফ বলেন, “এবার ধানের চেহারা খুব ভালো। প্রতি বিঘায় ১৯ থেকে ২০ মণ ফলন পাওয়ার আশা করছি। তবে বর্ষার শেষ দিকে ধানখেতে পোকামাকড়ের আক্রমণে বেশ বিপাকে পড়েছিলাম। অনেক টাকা খরচ করে ওষুধ স্প্রে করতে হয়েছে। আগের তুলনায় উৎপাদন খরচও অনেক বেড়ে গেছে।”
তিনি আরও বলেন, “ময়দানদিঘী বাজারে নতুন ধান প্রতি মণ এক হাজার ১০০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতি মণ ধানের দাম এক হাজার ৫০০ টাকা হলে আমরা কৃষকরা লাভবান হতে পারতাম। দুই বিঘা জমির ধান কাটার পর জমি চাষ দিয়ে আলু লাগাব। কিছু জমিতে শাকসবজিও চাষ করব। বাড়িতে খাওয়ার পর অবশিষ্ট শাকসবজি বাজারে বিক্রি করতে পারব।”
লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি উৎপাদনের আশা
পঞ্চগড় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল মতিন জানান, চলতি আমন মৌসুমে জেলায় এক লাখ ৪৪ হাজার হেক্টর জমিতে ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, জেলায় এক লাখ ৪৫ হাজার হেক্টর জমিতে আমন ধানের আবাদ হয়েছে।
তিনি বলেন, “এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আমরা বাম্পার ফলনের আশা করছি। জেলায় আমন ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তিন লাখ ৬১ হাজার ২৮৬ মেট্রিক টন। তবে এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি ধান উৎপাদিত হবে বলে আশা করছি।”
ধানের দাম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “নতুন কাঁচা ধান বাজারে ওঠায় এখনো দাম কিছুটা কম। পুরো মৌসুম শুরু হলে এবং মিলাররা ধান কেনা শুরু করলে দাম আরও বাড়বে বলে আশা করছি। এ ছাড়া আগাম ধান কাটার পর জমিতে আলু, গম, সরিষাসহ বিভিন্ন শাকসবজি আবাদ করে কৃষকরা বাড়তি আয় করতে পারবেন।”
আগাম জাতের আমন ধান চাষে পঞ্চগড়ে কৃষকের ঘরে আগেভাগেই উঠছে নতুন ফসল। পাশাপাশি কর্মসংস্থান বাড়ছে কৃষিশ্রমিকদের। একই জমিতে একাধিক ফসল আবাদের সুযোগ তৈরি হওয়ায় কৃষকের আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলের কৃষিতে উন্মোচিত হচ্ছে নতুন সম্ভাবনা।





