সাতক্ষীরায় ৬৮০ কিমি বেড়িবাঁধ, ঝুঁকিতে ৪১ কিমি
প্রকাশিত হয়েছে : 3 November 2026, 11:34 pm

ছবি: পূর্বদিক
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি: সাতক্ষীরার উপকূলীয় উপজেলা শ্যামনগর ও আশাশুনিতে প্রায় ৬৮০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে ৪১ কিলোমিটার বাঁধ অতিঝুঁকিপূর্ণ এবং শতাধিক কিলোমিটার বাঁধ রয়েছে ঝুঁকির মধ্যে। বিশেষ করে আশাশুনির প্রতাপনগর ও আনুলিয়া এবং শ্যামনগরের পদ্মপুকুর ইউনিয়নের বেড়িবাঁধের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। প্রতিকূল আবহাওয়া কিংবা জোয়ারের পানি বাড়লেই এসব বাঁধে ভাঙন দেখা দেয়। এতে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও মৎস্যঘের প্লাবিত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন হাজারো মানুষ। অনেকের রাত কাটে বাঁধ পাহারা দিয়ে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বাঁধে ছিদ্র করে নাইনটি পাইপ বসিয়ে নদী থেকে লবণাক্ত পানি তুলে চিংড়ি চাষ করাও ভাঙনের অন্যতম কারণ। অন্যদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বলছে, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণে অন্তত দুই হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা সম্ভব হয়নি। এখন সরকারি অর্থায়নে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের জন্য প্রকল্প প্রণয়নের কাজ চলছে।
আশাশুনির প্রতাপনগর ইউনিয়নের শ্রীপুর-কুড়িকাহনিয়া গ্রামের আশিউর্ধ্ব মনিরুদ্দীন গাজীর জীবনের গল্প নদীভাঙনের নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। কপোতাক্ষ নদের ভাঙনে পাঁচ বিঘা জমি হারিয়ে এখন তাঁর মালিকানায় রয়েছে মাত্র পাঁচ কাঠা। বৃদ্ধ বয়সে কাজ করতে না পারায় থাকতে হচ্ছে জামাতার বাড়িতে। গণমাধ্যমে বারবার সাক্ষাৎকার দিলেও নিজের দুর্দশার কোনো পরিবর্তন দেখেননি তিনি।
একই গ্রামের ৮৫ বছর বয়সী ওমর আলীরও একই পরিণতি। তিন বিঘা জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে এখন অবশিষ্ট রয়েছে মাত্র দুই শতক। কপোতাক্ষ নদের পাড়ের ঢালে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন তিনি। এভাবে শ্রীপুর গ্রামের প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বদলে গেছে এলাকার মানচিত্রও।
নদীভাঙনে সহায়-সম্বল হারিয়ে এ এলাকার কয়েক হাজার পরিবার কেউ নিঃস্ব, কেউবা উদ্বাস্তু হয়েছেন। আবার অনেকে অবশিষ্ট জমিতে নতুন করে গড়ে তুলেছেন ‘দৃষ্টিনন্দন’ গ্রাম। কপোতাক্ষ নদের এক পাড় ভেঙে প্রতাপনগর ইউনিয়নে নতুন গ্রাম দৃষ্টিনন্দনের সৃষ্টি হয়েছে, অন্য পাড়ে খুলনার কয়রা উপজেলার দশালিয়া গ্রাম গড়ে উঠেছে। নদীপাড়ের এসব মানুষের দাবি, সাময়িক ত্রাণ নয়, তাঁরা চান স্থায়ী বেড়িবাঁধ।
তবে সরেজমিনে প্রতাপনগর ও কুড়িকাহনিয়া ইউনিয়নের কপোতাক্ষ নদের বাঁধে নাইনটি পাইপের ব্যবহার দেখা যায়নি।
অন্যদিকে আশাশুনির প্রতিবেশী উপজেলা শ্যামনগরের সর্বশেষ ইউনিয়ন পদ্মপুকুরে নদীভাঙনের চিত্র ভিন্ন। স্থানীয়দের অভিযোগ, বেড়িবাঁধে ছিদ্র করে নাইনটি পাইপ বসিয়ে লবণাক্ত পানি তুলে চিংড়ি চাষ করায় বাঁধ দুর্বল হয়ে পড়ছে। মুষ্টিমেয় প্রভাবশালী চিংড়িচাষির এমন কর্মকাণ্ডে পুরো ইউনিয়নের বাসিন্দারা ভোগান্তিতে পড়ছেন। প্রতিবাদ করলে বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হতে হয় বলেও অভিযোগ তাঁদের। স্থানীয়দের দাবি, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছু কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করেই বছরের পর বছর এভাবে পাইপ ব্যবহার করা হচ্ছে।
প্রতাপনগর ইউনিয়নের কুড়িকাহনিয়া গ্রামের স্থানীয় সংবাদকর্মী মাসুম বিল্লাহ বলেন, শ্যামনগর ও আশাশুনি উপকূলীয় অঞ্চলে ৬৮০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে ৪১ কিলোমিটার অতিঝুঁকিপূর্ণ। এ ছাড়া শতাধিক কিলোমিটার বাঁধ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এসব বাঁধ স্থায়ীভাবে নির্মাণ করে মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি অবহেলিত থাকায় উপকূলের মানুষের জীবনমানের কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হচ্ছে না।
প্রতাপনগর ইউনিয়নের স্থানীয় বিএনপি নেতা আব্দুল খালেক বলেন, তাঁদের ইউনিয়নের কুড়িকাহনিয়া, সুভদ্রাকাটি, চাকলা ও হরিষখালী এলাকার চারটি পয়েন্টের বাঁধ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। মাসখানেক আগেও কুড়িকাহনিয়া পয়েন্টে ভাঙন দেখা দিলে এলাকাবাসী স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ মেরামত করেন। এ সময় পানি উন্নয়ন বোর্ড জিও ব্যাগ, জিও টিউব ও সিনথেটিক সামগ্রী দিয়ে সহযোগিতা করলেও তা স্থায়ী সমাধান নয়।
স্থানীয়দের সঙ্গে ভাঙন রোধে কাজ করার পর পাউবো কত টাকা বিল করেছে, সে বিষয়েও তাঁদের স্পষ্ট ধারণা নেই বলে অভিযোগ করেন তিনি। দ্রুত এসব বাঁধ স্থায়ীভাবে নির্মাণের দাবি জানান স্থানীয়রা।
শ্যামনগরের পদ্মপুকুর ইউনিয়নের বাসিন্দারাও নাইনটি পাইপের ব্যবহার নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে বাঁধে পাইপ বসিয়ে লবণাক্ত পানি তোলা হলেও পানি উন্নয়ন বোর্ড কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না। ভুক্তভোগীরা নির্দিষ্ট ক্লোজারের মাধ্যমে নাইনটি পাইপ ব্যবহারের ব্যবস্থা করা এবং দ্রুত স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুর রহমান তাযকিয়া বলেন, আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ও আনুলিয়া ইউনিয়নের বেড়িবাঁধের অবস্থা খুবই খারাপ। একই সঙ্গে শ্যামনগরের পদ্মপুকুর ইউনিয়নের বাঁধেরও একাধিক স্থানে ভাঙন রয়েছে। এসব বাঁধ জাইকার অর্থায়নে নির্মাণের পরিকল্পনা ও কার্যক্রম চলছিল। কিন্তু জাইকা অর্থায়ন না করায় পরবর্তী সময়ে সরকারি অর্থায়নে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে আরও বেশ কিছুটা সময় লাগবে।
উপকূলের মানুষের প্রত্যাশা, প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দীর্ঘসূত্রতা কাটিয়ে দ্রুত স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হবে। যাতে প্রতিনিয়ত নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ত পানির আতঙ্ক নিয়ে তাঁদের আর রাত কাটাতে না হয়।





