শ্রীমঙ্গলে বইপড়া উৎসবের চূড়ান্ত পরীক্ষা, অংশ নিল ৭৪০ শিক্ষার্থী
প্রকাশিত হয়েছে : 19 September 2026, 10:47 pm

ছবি: পূর্বদিক
শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি: মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘বইপড়া উৎসব-২০২৬’-এর চূড়ান্ত পর্ব ‘ফল পর্বের’ পরীক্ষা। উপজেলার ৩৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও উন্মুক্ত বিভাগ থেকে মোট ৭৪০ জন শিক্ষার্থী এ পরীক্ষায় অংশ নেয়।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) সকালে শহরের ভিক্টোরিয়া উচ্চবিদ্যালয়ে এ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষা শেষে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান চৌধুরী ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান।
বই পড়ার প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ তৈরি, পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজ নির্মাণের লক্ষ্যে আয়োজিত এ উৎসবের চূড়ান্ত পর্বে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছিল ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। নির্ধারিত বই পড়ার পর অর্জিত জ্ঞান ও পাঠবোধ যাচাই করতে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় অংশ নেয়।
চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছিল বিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি উন্মুক্ত বিভাগের পাঠকরাও। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে উৎসবটি পরিণত হয় পাঠ ও জ্ঞানচর্চার এক মিলনমেলায়। আয়োজকদের প্রত্যাশা, বইপড়া উৎসবের মাধ্যমে শ্রীমঙ্গলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ আরও বাড়বে। একই সঙ্গে নিয়মিত পাঠচর্চার মধ্য দিয়ে তারা জ্ঞান, মনন ও মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে।
বইপড়া উৎসবের পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা জানায়, শ্রীমঙ্গল উপজেলায় এবার দ্বিতীয়বারের মতো ‘বই পড়া উৎসব’ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে বই পড়া প্রতিযোগিতার একেবারে চূড়ান্ত পরীক্ষা। গতবারও এ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছিল। পুরো প্রতিযোগিতাটি প্রায় দেড় থেকে দুই মাসব্যাপী একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়।
অংশগ্রহণকারী আরেকজন শিক্ষার্থী বলেন, “এ প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পেরে আমি খুবই আনন্দিত। প্রত্যেক শিক্ষার্থীই অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্তভাবে এতে অংশগ্রহণ করেছে। একাডেমিক বইয়ের পাশাপাশি এই প্রতিযোগিতার মাধ্যমে আমরা আরও অনেক নতুন বিষয় জানতে পারছি। নির্ধারিত বই পড়ার মাধ্যমে আমাদের মধ্যে নতুন একটি দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছে, যা হয়তো শুধু পাঠ্যবই পড়লে আমরা জানতে বা উপলব্ধি করতে পারতাম না। বর্তমান জেন-জি প্রজন্মের জন্য এটি অত্যন্ত কার্যকর ও সময়োপযোগী একটি উদ্যোগ।”
ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অয়ন চৌধুরী বলেন, “আজ শ্রীমঙ্গল উপজেলায় বইপড়া উৎসবের চূড়ান্ত পর্ব বা ‘ফল পর্ব’-এর চূড়ান্ত মূল্যায়ন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। শ্রীমঙ্গলের মাধ্যমিক, দাখিল ও কলেজ পর্যায়ের ৩৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা আজকের এই চূড়ান্ত মূল্যায়নে অংশগ্রহণ করছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন পেশাজীবীও উন্মুক্ত বিভাগে এই মূল্যায়নে অংশ নিচ্ছেন।”
তিনি বলেন, “বই পড়াকে ঘিরে শ্রীমঙ্গলে এক ধরনের চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। মানুষ বই পড়ার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে, বই পড়ে নিজেকে জানতে এবং জগতকে জানতে চাইছে। বিষয়টি আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের ও উৎসাহব্যঞ্জক। আমরা আশা করি, বই পড়ার এই চর্চা ও ধারাবাহিকতা আগামী দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকবে।”
দেবাশীষ দাশ বলেন, “বাংলা ও বিশ্বসাহিত্যের উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, বিজ্ঞানবিষয়ক বই, বিদেশি সাহিত্য, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বই, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলামসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যতিক্রমী ও বিখ্যাত বই নিয়ে এই বই পড়ার আয়োজন করা হয়েছে। মুকুল ও ফুল পর্ব মিলিয়ে মোট ৩৮টি বই এই আয়োজনের অন্তর্ভুক্ত। এই আয়োজনের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো, ছেলেমেয়েদের আলোচনার বিষয়বস্তুতে এখন বই আসছে। তারা ক্লাসে, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় এবং বিভিন্ন আলোচনায় বই নিয়ে কথা বলছে। এর মাধ্যমে বইয়ের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা তৈরি হচ্ছে, যা আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল।”
তিনি বলেন, “পরবর্তী প্রজন্মের মন-মানসিকতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সেই লক্ষ্যেই আমরা ছেলেমেয়েদের বইয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে এবং তাদের মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ ও অভ্যাস তৈরি করতে কাজ করছি।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান বলেন, ‘বই পড়ি, মন গড়ি’ স্লোগানে শ্রীমঙ্গলে শুরু হয়েছে বই পড়া উৎসব-২০২৬। এতে উপজেলার ৩৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা অংশ নিচ্ছে। পাশাপাশি শ্রীমঙ্গলে জন্ম বা কর্মসূত্রে বেড়ে ওঠা যেকোনো ব্যক্তি নিবন্ধনের মাধ্যমে এ উৎসবে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। সব মিলিয়ে বই পড়াকে ঘিরে শ্রীমঙ্গলে একটি উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, “এই উৎসবের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির পাশাপাশি দেশি-বিদেশি সাহিত্যিক ও মনীষীদের চিন্তাভাবনার সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে। এতে তাদের মেধা ও মনন পরিশীলিত হচ্ছে এবং তারা ভবিষ্যতের সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে নিজেদের প্রস্তুত করতে পারবে।”
মি. রহমান আরও বলেন, “উৎসবকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের লাইব্রেরিগুলোও সচল হয়েছে। শিক্ষার্থীরা মোবাইলের শর্টস ও রিলস থেকে বেরিয়ে অবসর সময়ে বই পড়ায় মনোযোগী হচ্ছে এবং বিভিন্ন স্কুলে পাঠচক্র গড়ে উঠছে। একটি-দুটি বই হয়তো একজন মানুষকে বদলে দেবে না, তবে বই পড়ার যে অভ্যাস তাদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে, সেটিই ভবিষ্যতে তাদের বড় হওয়ার অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে।”
মৌলভীবাজার-৪ (শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান চৌধুরী বলেন, “এটি মূলত সরকারের একটি উদ্যোগ। সরকার ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা এ ধরনের উদ্যোগে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছি। কারণ, শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তারাই ভবিষ্যতে দেশ পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাই তাদের উৎসাহিত করতে আমরা এ ধরনের আয়োজনকে গুরুত্ব দিচ্ছি। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীদের ভালো পুরস্কার দেওয়া হবে। ভবিষ্যতেও প্রতি বছর এ ধরনের প্রতিযোগিতা আয়োজন অব্যাহত থাকবে এবং আমরা এর সঙ্গে থাকব।”
পূর্বদিক/এসএ





