১ কোটি ৬৭ লাখ টাকার কোর্ট, নেই নিয়মিত খেলা
প্রকাশিত হয়েছে : 19 September 2026, 10:54 pm

ছবি: পূর্বদিক
নোবিপ্রবি প্রতিনিধি: নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (নোবিপ্রবি) প্রায় ১ কোটি ৬৭ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত নতুন ক্রীড়া অবকাঠামোর অধিকাংশই উদ্বোধনের কয়েক মাস পরও নিয়মিত ব্যবহারের বাইরে রয়েছে। খেলাধুলা ও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কোর্টগুলোর বিভিন্ন অংশে আগাছা ও ঘাস জন্মেছে। এতে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত এসব অবকাঠামো নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও খেলোয়াড়রা।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্মিত বাস্কেটবল ও লন টেনিস কোর্টে নিয়মিত খেলাধুলার কার্যক্রম নেই। অন্যদিকে ভলিবল কোর্টের আশপাশে ব্যাপকভাবে আগাছা ও ঘাস জন্মেছে। কোথাও কোথাও ঘাস বুকসমান হয়ে যাওয়ায় কোর্টের স্বাভাবিক পরিবেশও নষ্ট হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সরকারি অর্থ ব্যয়ে ক্রীড়া অবকাঠামো নির্মাণ করা হলেও সেগুলো সচল রাখা, নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতার আয়োজনের ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। দীর্ঘদিন ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ না হলে কোর্ট ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। পরে সংস্কারে আবারও অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন হলে তা সরকারি অর্থের অপচয় ডেকে আনতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, শিক্ষার্থীদের জন্য নির্মিত ভলিবল ও বাস্কেটবল কোর্ট তৈরিতে ব্যয় হয়েছে ৫৩ লাখ ৬৩ হাজার ৮২১ টাকা। আর শিক্ষক-কর্মকর্তাদের জন্য নির্মিত লন টেনিস কোর্টে ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ১৩ লাখ ৮২ হাজার ৭০৪ টাকা। দুটি প্রকল্পে মোট ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ৬৭ লাখ ৪৬ হাজার ৫২৫ টাকা।
সূত্র জানায়, গত ১৫ ফেব্রুয়ারি শিক্ষক-কর্মকর্তাদের জন্য নির্মিত লন টেনিস কোর্ট এবং ১৬ ফেব্রুয়ারি শিক্ষার্থীদের জন্য নির্মিত বাস্কেটবল ও ভলিবল কোর্টের উদ্বোধন করেন তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইসমাইল। তবে উদ্বোধনের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শরীরচর্চা বিভাগের উদ্যোগে এসব কোর্টে নিয়মিত কোনো প্রতিযোগিতা বা টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হয়নি।
নোবিপ্রবির বাস্কেটবল খেলোয়াড় আলভি হাসান বলেন, ক্রীড়া অবকাঠামো নির্মাণ অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে শুধু কোর্ট নির্মাণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বাস্কেটবল কোর্ট নির্মাণের প্রায় এক বছর হতে চললেও সেখানে নিয়মিত খেলা, প্রশিক্ষণ বা অনুশীলনের কার্যকর ব্যবস্থা নেই। কোর্ট থাকলেও বল, প্রশিক্ষক ও নিয়মিত খেলার সুযোগের সংকট রয়েছে। কোর্ট পরিচালনা ও সচল রাখার দায়িত্ব শরীরচর্চা বিভাগের, শিক্ষার্থীদের নয়।
ভলিবল কোর্ট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সারা বছর অনুশীলনের সুযোগ না দিয়ে কোনো টুর্নামেন্টের দুই-তিন সপ্তাহ আগে অনুশীলন শুরু করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে খেলোয়াড়ের সংকট নেই। প্রয়োজন নিয়মিত প্রশিক্ষণ, কোচিং, প্রতিযোগিতা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা।
নোবিপ্রবি স্পোর্টস ক্লাবের সভাপতি জাহেদুল হক বলেন, বাস্কেটবল কোর্টটি দীর্ঘদিন ধরে কার্যত অচল অবস্থায় রয়েছে। শিক্ষার্থীদের খেলার আগ্রহ থাকলেও শরীরচর্চা বিভাগ থেকে নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়নি। শিক্ষক-কর্মকর্তাদের জন্য নির্মিত লন টেনিস কোর্টটিও পর্যাপ্ত ব্যবহার হচ্ছে না। এটি শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হলে তারা খেলার সুযোগ পেতেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রীড়া চর্চার পরিধি বাড়ত। এভাবে পড়ে থাকলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত কোর্টগুলো অযত্নে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ক্রীড়া কার্যক্রম ও তদারকির বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শরীরচর্চা বিভাগের ডেপুটি ডিরেক্টর সঞ্জীব কুমার দে বলেন, বাস্কেটবল কোর্ট প্রস্তুত রয়েছে। টুর্নামেন্ট আয়োজন ও প্রশিক্ষণের জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে টুর্নামেন্ট ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করা হবে। শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন হলে কোচের ব্যবস্থাও করা সম্ভব।
ভলিবল কোর্ট সম্পর্কে তিনি বলেন, নির্ধারিত জায়গার বাইরে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তার জন্য অতিরিক্ত কিছু জায়গায় বালু ভরাটের কাজ শেষ হলে সেখানে খেলা শুরু করা যাবে। লন টেনিস কোর্টটি মূলত শিক্ষক-কর্মকর্তাদের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে। তবে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে বিশেষ প্রয়োজনে শিক্ষার্থীরাও সেখানে অনুশীলনের সুযোগ পেতে পারে। তাঁর দাবি, জাতীয় মান বজায় রেখে কোর্টগুলো নির্মাণ করা হয়েছে এবং দ্রুত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা নেই। পাশাপাশি বাস্কেটবল টুর্নামেন্টসহ বিভিন্ন ক্রীড়া আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
শরীরচর্চা দপ্তরের পরিচালক জামাল উদ্দীন বলেন, ভলিবল কোর্ট দুটির বর্তমান অবস্থা সরেজমিনে পরিদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে। শুধু কোর্ট নির্মাণ করলেই হয় না, খেলোয়াড়দের চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা এবং উপযুক্ত মাটির ব্যবস্থাও প্রয়োজন। এ কারণে কিছুটা সময় লাগছে। ভলিবল কোর্টের আশপাশের জায়গা প্রস্তুত করতে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা ব্যয় করা যায় কি না, সেটিও বিবেচনা করা হচ্ছে। অপ্রয়োজনে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে চায় না কর্তৃপক্ষ।
লন টেনিস কোর্টের ব্যবহার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কোর্টটি শিক্ষক-কর্মকর্তাদের জন্য নির্মাণ করা হলেও সেখানে যদি কেউ খেলতে না আসেন, তাহলে শুধু নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় বিষয়টির সমাধান করা যাবে না। অল্পসংখ্যক মানুষের ব্যবহারের জন্য এত অর্থ ব্যয় করা কতটা যৌক্তিক ছিল, সেটি প্রকল্প গ্রহণের সময়ই বিবেচনা করা প্রয়োজন ছিল। এখন অর্থ ব্যয় হয়ে গেছে। তবে শিক্ষার্থীদের অর্থে বাস্তবায়িত এসব কাজের জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন।
সার্বিক বিষয়ে নোবিপ্রবির উপাচার্য ড. গোলাম রব্বানী বলেন, শিক্ষার্থীদের ভলিবল ও বাস্কেটবল খেলার সুযোগ বাড়াতে মাঠ সংস্কার করে ব্যবহার উপযোগী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্ষাকালে বৃষ্টির কারণে মাঠ পিচ্ছিল হয়ে যাওয়ায় খেলাধুলায় সমস্যা হয়। বৃষ্টি কমে গেলে মাঠ সংস্কারের কাজ করে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত খেলার সুযোগ তৈরি করা হবে।
শিক্ষকদের জন্য নির্মিত লন টেনিস কোর্ট সম্পর্কে উপাচার্য বলেন, শিক্ষক ও খেলোয়াড়ের সংখ্যা কম থাকায় বর্তমানে সেখানে নিয়মিত খেলা হচ্ছে না। তবে শিক্ষক ও আগ্রহী ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ বাড়িয়ে খেলাটি নিয়মিত করার চেষ্টা করা হবে। উদ্বোধনের দিন শিক্ষক ও বাইরের অতিথিদের অংশগ্রহণে একটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং তিনিও ওই ম্যাচে অংশ নিয়েছিলেন।
পূর্বদিক/এসএ





