‘টার্গেট কিলিং’ হিসেবে দেখছে পুলিশ
খুলনায় পরপর দুই খুন, চরমপন্থী আতঙ্কের শঙ্কা
প্রকাশিত হয়েছে : 7 October 2026, 2:52 pm

ছবি: পূর্বদিক
খুলনা প্রতিনিধি: খুলনায় পরপর দুই দিনে পাশাপাশি দুই উপজেলায় দুই ব্যক্তি গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। গত রোববার দিঘলিয়া উপজেলায় পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল-জনযুদ্ধ)-এর আঞ্চলিক নেতা নাসিমুল গণি করিম ওরফে নাসিম (৫৫) এবং পরদিন সোমবার রূপসা উপজেলার দুর্জনীমহল গ্রামে বাসশ্রমিক আক্তার ঢালী (৫৮) গুলিতে নিহত হন। পরপর দুই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এলাকাবাসীর মধ্যে চরমপন্থীদের তৎপরতা নতুন করে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে পুলিশ বলছে, প্রাথমিকভাবে দুটি হত্যাকাণ্ডকেই ‘টার্গেট কিলিং’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত রোববার বেলা পৌনে ১২টার দিকে দিঘলিয়া উপজেলার ফরমাইশখানা এলাকায় নিজ বাড়ির সামনে একটি দোকানে চা পান করছিলেন নাসিম। এ সময় সন্ত্রাসীরা তাকে গুলি করে পালিয়ে যায়। ঘটনাস্থলেই তিনি নিহত হন।
হত্যাকাণ্ডের ৭২ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। স্থানীয়দের দাবি, ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজে হামলাকারীদের চেহারা স্পষ্ট দেখা গেছে। এরপরও তাদের শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করতে না পারায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
গত সোমবার রাতে নিহত নাসিমের স্ত্রী মোছাম্মৎ সেলিনা খাতুন বাদী হয়ে দিঘলিয়া থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা ৭-৮ জনকে আসামি করা হয়েছে।
খুলনা জেলা পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ফরমাইশখানা এলাকায় ভৈরব নদকেন্দ্রিক জ্বালানি তেল পাচার চক্রের সঙ্গে ভাগবাটোয়ারা নিয়ে নাসিমের বিরোধ ছিল। এ ছাড়া স্থানীয় একটি গ্রুপের সঙ্গেও তার দ্বন্দ্ব ছিল। আপাতত এসব বিষয় সামনে রেখেই তদন্ত করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, কয়েক দিন আগে খুলনার ‘ঠান্ডা পীর’ নামে পরিচিত এক শীর্ষ চরমপন্থীর ছেলের সঙ্গে নাসিমের বিরোধের বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনাটিকে পুলিশ ‘টার্গেট কিলিং’ হিসেবে দেখছে। ঘটনাস্থল থেকে ভিডিও ফুটেজসহ বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
রূপসায় বাসশ্রমিক হত্যা
এদিকে গত সোমবার সন্ধ্যার পর রূপসা উপজেলার দুর্জনীমহল গ্রামের শহীদের মোড় এলাকায় ঢালী বাড়ির সামনে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন বাসশ্রমিক আক্তার ঢালী। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তার লাশ দাফন করা হয়। এ ঘটনায় প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত থানায় মামলা হয়নি।
আক্তার ঢালী হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক বলেন, গত ১৫ আগস্ট আক্তার ঢালীর বড় ছেলে জয় ঢালীকে জবাই করে হত্যা করা হয়। ওই হত্যা মামলার বাদী ছিলেন আক্তার ঢালী। এ ঘটনায় পুলিশ একজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠায়।
এরপর গত ২১ সেপ্টেম্বর রূপসা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন আক্তার ঢালী। সেখানে মামলা প্রত্যাহার করে নেওয়ার জন্য তাকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করেন তিনি।
পুলিশ সুপার বলেন, আপাতত ওই বিষয়টিকেই আক্তার ঢালী হত্যার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে সামনে রেখে তদন্ত করা হচ্ছে। এটিকেও ‘টার্গেট কিলিং’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। খুলনায় বেশির ভাগ হত্যাকাণ্ডই কোনো না কোনো ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে সংঘটিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে একজন পেশাদার কিলারের সম্পৃক্ততার বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
জিডিতে নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়েছিলেন আক্তার
গত ২১ সেপ্টেম্বর রূপসা থানায় করা জিডি নম্বর-১৪১২-এ আক্তার ঢালী উল্লেখ করেন, ১৮ সেপ্টেম্বর সেনের বাজার এলাকায় তিনি কর্মরত থাকা অবস্থায় মুনজিল শেখ, মোরাদ শেখ, মাসুদ মোল্যা, রোপা মোল্যাসহ কয়েকজন তাকে ডেকে এক পাশে নিয়ে যান। তারা মামলা তুলে নেওয়ার জন্য তাকে বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেন এবং জীবননাশের ভয় দেখিয়ে চলে যান।
জিডিতে আক্তার আরও উল্লেখ করেন, তার ছেলে জয় ঢালীকে শহীদের মোড় এলাকায় কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় ১৬ আগস্ট ২০২৬ তারিখে মামলা করা হয়। মামলার আসামিরা ঢাকা হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে এলাকায় এসে মামলা প্রত্যাহারের জন্য তার ও পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং জানমালের ক্ষতির হুমকি দিচ্ছে।
জিডিতে তিনি বলেন, আসামিদের এমন কর্মকাণ্ডে তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এ কারণে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য জিডি করা প্রয়োজন।
‘ছেলের মামলা করাই কাল হলো’
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ভাইয়ের লাশ নিতে এসে আতাউল ঢালী বলেন, নিহত আক্তার ঢালী তার মেজ ভাই। তিনি রূপসার সেনের বাজারে বাসের কলারম্যান হিসেবে কাজ করতেন। তার কোনো শত্রু ছিল না। ভাতিজা জয় ঢালী হত্যা মামলার বাদী হওয়ায় তাকে জীবন দিতে হয়েছে।
আতাউল বলেন, ‘‘আমরা এখন চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছি। ঘটনার সময় এলাকায় কোনো লোডশেডিং ছিল না। অথচ গুলি করার সময় বাড়ির ভেতর ও বাইরের লাইট বন্ধ হয়ে যায়। অন্ধকার পরিবেশেই ভাইকে হত্যা করা হয়।’’
চরমপন্থীদের উত্থানের আশঙ্কা
পরপর দুই দিনে দিঘলিয়া ও রূপসা উপজেলায় দুটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থী সংগঠনগুলোর তৎপরতা নতুন করে বাড়ছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, একসময় রূপসা ও দিঘলিয়া এলাকায় নিষিদ্ধ ‘লাল পতাকা’, ‘বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি’, ‘নিউ বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি’, ‘পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল)’ ও ‘পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল-জনযুদ্ধ)’সহ বিভিন্ন চরমপন্থী সংগঠনের দৌরাত্ম্য ছিল। এসব গোষ্ঠীর পারস্পরিক বিরোধ ও সংঘাতে নিয়মিত হত্যাকাণ্ড ঘটত।
তাদের আশঙ্কা, সাম্প্রতিক দুটি হত্যাকাণ্ডের পর সেই পুরোনো পরিস্থিতি ফিরে আসার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে।
পূর্বদিক/এসএ





