মদনে বিদ্যালয় রক্ষা প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ
প্রকাশিত হয়েছে : 8 October 2026, 11:46 pm

ছবি: পূর্বদিক
মদন (নেত্রকোনা) প্রতিনিধি: নেত্রকোনার মদন উপজেলার তিয়শ্রী ইউনিয়নের বাগজান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রক্ষায় নদীভাঙন প্রতিরোধে নেওয়া জরুরি প্রকল্পের কাজে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রাক্কলন অনুযায়ী কাজ না করে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
এ ঘটনায় ঠিকাদার ও প্রকল্পের তদারকি কর্মকর্তা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মুস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে গত ২০ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেন হোসাইন কবির নামে এক ব্যক্তি।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, মগড়া নদীর ভাঙন থেকে বাগজান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রক্ষায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১৯ লাখ ৮২ হাজার ২৮২ টাকা ব্যয়ে ৮০ মিটার এলাকায় জরুরি ভাঙন প্রতিরোধ প্রকল্প নেওয়া হয়। প্রাক্কলন অনুযায়ী, ১২ মিটার দৈর্ঘ্যের ১৩টি শক্ত কাঠের বল্লা সোনালু, তেঁতুল বা জামগাছের কাঠ দিয়ে এবং ৮০ মিটার দৈর্ঘ্যে কমপক্ষে ৩৯টি ব্যারাক বাঁশের পাইলিং করার কথা।
এ ছাড়া ওয়ালিং পিস ২০ মিলিমিটার নাট-বল্টু দিয়ে আটকানো, ২৫০ কেজি ওজনের ৩ হাজার ১২৫টি জিও-ব্যাগ ডাম্পিং এবং ১৭৫ কেজি ওজনের ১ হাজার ২১০টি শুকনো বালুর জিও-ব্যাগ প্লেসিং করার কথা রয়েছে। জিও-ব্যাগে ব্যবহৃত শুকনো বালু ওজন করে নিশ্চিত করারও বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রাক্কলন অনুযায়ী কাজ না করে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয়দের না জানিয়েই ঠিকাদার নিজের মতো করে কাজ করেছেন। শুকনো বালুর পরিবর্তে ভেজা বালু ব্যবহার, শক্ত কাঠের বল্লার পরিবর্তে মেহগনির গাছের ডাল ব্যবহারসহ প্রাক্কলনে উল্লেখিত বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার না করার অভিযোগ রয়েছে। প্রকল্প তদারকি কর্মকর্তা মুস্তাফিজুর রহমানের যোগসাজশে ঠিকাদার ইচ্ছামতো কাজ করেছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
স্থানীয়রা জানান, কাজ চলাকালে অনিয়মের অভিযোগ তুলে বাগজান গ্রামের সচেতন কয়েকজন ব্যক্তি স্থানীয় ইউপি সদস্যকে সঙ্গে নিয়ে একবার কাজ বন্ধ করে দেন। পরে প্রাক্কলনের তথ্য গোপন রেখে ঠিকাদার স্থানীয়দের আপত্তি উপেক্ষা করে কাজ শেষ করেন বলে অভিযোগ তাদের।
গত বুধবার (৭ অক্টোবর) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নদীভাঙন প্রতিরোধ প্রকল্পের কাজ ইতোমধ্যে শেষ করেছেন ঠিকাদার। তবে প্রকল্পের কাজ নিয়ে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।
বাগজান গ্রামের বাসিন্দা আশরাফুল ইসলাম আকন্দ বলেন, “স্কুল রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্প দেওয়ার খবর শুনে খুব খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু ঠিকাদার এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি ও স্কুল কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে নিজের মতো করে কাজ শুরু করায় হতাশ হয়েছি। প্রাক্কলন সম্পর্কে কাউকে কিছু জানতে দেওয়া হয়নি। আমরা চাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় সংসদ সদস্য বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করবেন। অনিয়ম প্রমাণিত হলে ঠিকাদারকে শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।”
একই গ্রামের বাসিন্দা পুতুল মিয়া বলেন, “কাজে কী করা হয়েছে, তা এখন আর বলার অপেক্ষা রাখে না। পানি কমে যাওয়ায় পুরো চিত্র দেখা যাচ্ছে। এভাবে সরকারি অর্থের অপচয় করা হয়, এই কাজটি দেখলেই তা বোঝা যায়।”
তিয়শ্রী ইউনিয়নের সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আব্দুল্লাহ বলেন, “ঠিকাদার একদিন আমাকে ডেকে একটি বালুর বস্তা ওজন করে দেখান। ব্যাগে ২৮০ কেজি বালু ছিল। তবে জিও-ব্যাগে ভেজা বালু দেওয়া হয়েছে। এস্টিমেটে কী আছে, তা আমি জানি না।”
অভিযোগকারী হোসাইন কবির বলেন, “বাগজান স্কুল রক্ষা প্রকল্পে অনিয়ম বললে ভুল হবে, এখানে এক কথায় সাগর চুরি হয়েছে। এই কাজে ঠিকাদারকে টাকার বিনিময়ে সহযোগিতা করেছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মুস্তাফিজুর রহমান। আশা করি কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।”
তবে ঠিকাদারের প্রতিনিধি উজ্জ্বল তালুকদার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে জানানো হয়েছে, ডিসি স্যার অভিযোগ পেয়ে তাদের ডেকেছেন। তবে আমরা কাজে কোনো অনিয়ম করিনি।”
অভিযোগ অস্বীকার করে নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, “কোনো প্রকল্প দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। এ বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী স্যারের বক্তব্য নিতে পারেন।”
বাগজান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাদেকুর রহমান বলেন, “বিভিন্ন গণমাধ্যমে অনিয়মের সংবাদ প্রকাশের পর ঠিকাদার বালুভর্তি জিও-ব্যাগ নদীতে ফেলার সময় আমাকে বা পিয়নকে ডেকে নিয়েছেন। তবে এর আগে বল্লাসহ যেসব উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলো পরিবর্তন করা হয়নি। জিও-ব্যাগে ভেজা বালু দেওয়া হয়েছে। কয়েক দিন হলো কাজ শেষ হয়েছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রাক্কলন সম্পর্কে কিছুই জানতে পারিনি।”
এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, “মদন উপজেলার বাগজান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নদীভাঙন প্রতিরোধ প্রকল্পে অনিয়মের একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীকে বলা হয়েছে।”
পূর্বদিক/এসএ





